মাউন্ট এভারেস্টকে দূষণমুক্ত রাখতে চালু করা ‘ডিপোজিট স্কিম’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নেপাল সরকার। ১১ বছর চালু থাকার পরও প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই স্কিমের আওতায় পর্বতারোহীদের অভিযানের আগে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা দিতে হতো, যা ফেরত দেওয়া হতো যদি তারা অন্তত আট কেজি বর্জ্য নিচে নামিয়ে আনতেন। তবে নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অধিকাংশ আরোহী জামানতের অর্থ ফেরত পেলেও এভারেস্টের সামগ্রিক দূষণ পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।
নেপাল পর্যটন বিভাগের পরিচালক হিমালা গৌতম জানান, প্রকল্পটি পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রশাসনিক জটিলতা বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, আরোহীরা সাধারণত নিচের ক্যাম্পগুলো থেকে আবর্জনা সংগ্রহ করলেও উচ্চ ক্যাম্পগুলোতে জমে থাকা বর্জ্য অবহেলিত থেকে যায়। সাগরমাথা দূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিটির প্রধান নির্বাহী শেরিং শেরপা জানান, ওপরের ক্যাম্পগুলোতেই দূষণের সমস্যা সবচেয়ে গুরুতর, যেখানে তাঁবু, প্লাস্টিকের ক্যান, খাবারের প্যাকেট ও ব্যবহৃত অক্সিজেন সিলিন্ডার ফেলে যাওয়া অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন পর্বতারোহী গড়ে ১২ কেজি বর্জ্য তৈরি করেন, কিন্তু মাত্র আট কেজি ফেরত আনার শর্তে নিয়মটির ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। তারা এভারেস্টের পরিবেশ রক্ষায় আরও বাস্তবসম্মত নীতিমালা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
এভারেস্টে দূষণ রোধে ব্যর্থ হওয়ায় নেপালের ডিপোজিট স্কিম বাতিল
নেপালের দুর্নীতি তদন্ত কমিশন (সিআইএএ) পোখরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে ৫৫ জন ব্যক্তি ও একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন পাঁচ সাবেক মন্ত্রী, দশ সাবেক সচিব ও চীনা অর্থায়নে নির্মিত প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য কর্মকর্তারা। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্পের ব্যয় কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে প্রায় ৭ কোটি ৪৩ লাখ মার্কিন ডলার (৮৩৬ কোটি নেপালি রুপি) অনিয়মিতভাবে লেনদেন করা হয়েছে।
সিআইএএর অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ‘ক্ষতিকর অভিপ্রায়’ নিয়ে সংশোধন করা হয় এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না সিএএমসি ইঞ্জিনিয়ারিংকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। ২০১১ সালে গোপন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, ভুল প্রযুক্তিগত সমীক্ষা ও অস্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এটি নেপালের বিশেষ আদালতে দাখিল হওয়া সবচেয়ে বড় দুর্নীতি মামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলা বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর প্রতি জনআস্থা ও চীনা বিনিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
পোখরা বিমানবন্দর দুর্নীতিতে সাবেক মন্ত্রীসহ ৫৫ জনের বিরুদ্ধে নেপালে মামলা
নেপালে টানা ভারি বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে শুক্রবার থেকে অন্তত ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দেশটির পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কোশি প্রদেশে ৩৬ জন এবং মধেশ প্রদেশে ৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ইলাম জেলায় একাধিক ভূমিধসে ২৭ জন নিহত ও পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছে। উদয়পুরে দুইজন মারা গেছেন এবং একজন আহত। খোটাংয়ে বজ্রপাতে একজন নিহত, ভোজপুর ও মাকোয়ানপুরে কয়েকজন আহত হয়েছেন। পঞ্চথরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় ছয়জনের মৃত্যু এবং ছয়জন আহত হয়েছেন। এছাড়া বরায় একজন, রাসুয়ায় চারজন এবং কাঠমান্ডুতে নদীতে ভেসে গিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। টানা বৃষ্টিপাতে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা আরও বাড়ছে। উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নেপালের পূর্বাঞ্চলে ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোতে নিখোঁজদের খুঁজছেন উদ্ধারকর্মীরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজেন্দ্র বাজগাইনের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও দলীয় স্বজনপ্রীতির কারণে নেপাল এক গভীর সংকটে পড়েছে, যা শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনে সমাধান হবে না। তিনি দ্য হিমালয়ান টাইমস-কে বলেন, জনগণের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি ফেডারেল কাঠামো এখন দুর্নীতির কারখানায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সরকার থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত ঘুষ ও দলীয় প্রভাব সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। পোখরা ও লুম্বিনী বিমানবন্দরের মতো প্রকল্প নীতিনির্ধারণী দুর্নীতির কারণে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বাজগাইন সতর্ক করেন, সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া একনায়কতন্ত্র ডেকে আনতে পারে। তিনি প্রস্তাব করেন, স্থানীয় সরকার কাঠামো ৬০% হ্রাস, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে জন-নিজি অংশীদারিত্বে রূপান্তর, আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতিবাজদের বিচার ও সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার মতো উন্নয়ন রূপরেখা গ্রহণ করা জরুরি।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও দলীয় স্বজনপ্রীতির কারণে নেপাল এক গভীর সংকটে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির রাজনীতি বিশ্লেষক রাজেন্দ্র বাজগাইন।
নেপালের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির জেন-জি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া সুদান গুরুং। তিনি জানান, ইতোমধ্যে তারা দেশব্যাপী সমর্থকদের নিয়ে ‘মুভমেন্ট ফর চেঞ্জ’ আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, বিগত সরকার আমাদের রাজনীতিতে নামিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুতরা স্বার্থপর ও দুর্নীতিবাজ। সুদান গুরুং বলেন, তারা যদি এই ধরনের রাজনীতিই চায় তাহলে আমরা পরবর্তী নির্বাচনে লড়ব এবং পিছু হটব না। তার দল দেশ শাসনের জন্য প্রস্তুত উল্লেখ করে বলেন, ইতোমধ্যে স্বেচ্ছাসেবকরা দেশজুড়ে কমিটি গঠন শুরু করেছে। নেপালের প্রত্যেকটি মানুষের কথা শোনার জন্য কাজ করছে। তিনি জানান, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক দল গঠন করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। আগামী মার্চে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে পুরোনো রাজনৈতিক নেতাদের দেখতে চান না বলেও মন্তব্য করেন গুরুং। দুর্নীতিবাজ ও মানুষ হত্যার সুষ্ঠু বিচারের দাবিও জানান তিনি।
নেপালে বিক্ষোভ চলাকালীন সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ জন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়– বিভিন্ন সরকারি দফতর, বাসভবন ও অন্যান্য স্থাপনার ধ্বংসস্তূপ থেকে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বিক্ষোভ চলাকালে উত্তেজিত জনগণ সুপ্রিম কোর্ট, পার্লামেন্ট ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের বাড়িঘরে আগুন দেয়। সংঘর্ষ থামার পর সেসব স্থান থেকেই একে একে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে নিহতদের মরদেহ। এর আগে, মোট ৫২ জনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছিল প্রশাসন। বিক্ষোভে আহত হয়েছে ২ হাজারেরও বেশি মানুষ।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কির সুপারিশের ভিত্তিতে সংসদ ভেঙে দিয়েছেন নেপালের রাষ্ট্রপতি। নতুন নির্বাচনের তারিখ হলো ২০২৬ সালের ৫ মার্চ। শুক্রবার রাতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন সুশীলা। তার নেতৃত্বে ছোট মন্ত্রিসভার একটি সরকার গঠিত হয়েছে। এটির মেয়াদ থাকবে ৬ মাস। এরআগে নেপালের জেন-জির বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতি এবং সেনাবাহিনীর প্রধানের মধ্যে আলোচনা হয়। এরপর সুশীলাকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সবাই একমত হয়। সুশীলা কার্কি ২০১৬ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত নেপালের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। তিনি দেশটির প্রথম নারী প্রধান বিচারপতি হন। এবার প্রথম অন্তবর্তীকালীন নারী প্রধানমন্ত্রী। বিচারক থাকাকালীন তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন, এ কারণে জেন-জির কাছে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে।
নেপালের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি শুক্রবার সন্ধ্যায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেল শীতল নিবাসে তাকে শপথ গ্রহণ করিয়েছেন। কার্কি দেশের প্রথম মহিলা অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। রাষ্ট্রপতি পৌডেল তাকে সংবিধানের ধারা ৬১ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেছেন। ২০১৫ সালের নতুন সংবিধান প্রণয়নের পর সকল সরকার ধারা ৭৬ অনুযায়ী গঠিত হয়েছিল। কিন্তু কার্কির নিয়োগ ধারা ৬১ অনুযায়ী হওয়ায় এটি সংবিধান ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
জেন-জিদের আন্দোলনের মুখে নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলি পদত্যাগ করে সেনা ব্যারাকে আশ্রয় নিয়েছেন। দলের কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, লিপুলেখ সীমান্ত ইস্যু এবং রামের জন্মস্থান নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করায় তিনি ক্ষমতা হারিয়েছেন। এর আগে ওলি ঘোষণা দেন, লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি নেপালের অংশ—যা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ায়।
নেপালে বিক্ষোভের আগুনে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীর মৃত্যু হয়নি, তবে তার শারীরিক অবস্থা গুরুতর। মঙ্গলবার নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝালনাথ খানালের স্ত্রী রাজ্যলক্ষী চিত্রকরের মৃত্যুর খবর জানায় দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যম। সেই তথ্য প্রচার করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বার্তা সংস্থা এবং গণমাধ্যমও। তবে বৃহস্পতিবার সংশোধিত তথ্য জানানো হয়, রাজ্যলক্ষী বেঁচে আছেন। তবে শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে যাওয়ায় তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। দুই দিন আগে কাঠমান্ডুতে নেপালের খানালের বাড়িতে আগুন দেয় বিক্ষোভকারীরা। এ সময় ভেতরে আটকা পড়েন খানালের স্ত্রী রাজ্যলক্ষী চিত্রকর। বাড়ির ভেতরে থাকা অবস্থায় চিত্রকর অগ্নিদগ্ধ হন।
সহিংস নেপালে সেনারা গতকাল থেকে রাজধানীর রাস্তায় টহল দিচ্ছে এবং মানুষকে ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। মঙ্গলবার কয়েক হাজার তরুণ বিক্ষোভে যোগ দেয়। ‘জেন জি’ নেতৃত্বাধীন এই বিক্ষোভকারীরা সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়ি ভাঙচুর করে এবং পার্লামেন্ট ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারা মন্ত্রী পৃত্বি সুব্বা গুরুঙের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়, অর্থমন্ত্রী বিষ্ণু পোড়েলের বাসভবনে ইটপাটকেল ছোড়ে। এছাড়া ব্যাংকের গভর্নর বিশ্ব পোড়েল এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখকের বাড়িতেও হামলা চালায়। এক ভিডিওতে দেখা যায়, অর্থমন্ত্রীকে রাস্তায় ধাওয়া করে বিক্ষোভকারীরা লাথি মেরে আঘাত করছে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী অর্জু রানা দেওবা এবং তার স্বামী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেরবাহাদুর দেওবার বাড়িতে হামলা চালাচ্ছে জনতা। সেখানে শেরবাহাদুর দেওবাকে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে বসে থাকতে দেখা যায়। পরে সেনারা গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার দিয়ে মন্ত্রী ও তাদের পরিবারকে উদ্ধার করা হচ্ছে। উদ্ধার ঝুলিতে ঝুলে থাকা অবস্থায় তাদের উড়তে দেখা যায় কাঠমান্ডুর একটি হোটেলের ওপর দিয়ে। কারাগারের ভেতরও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেনারা দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেয় এবং বন্দিদের অন্য কারাগারে সরিয়ে নেয়।
নেপালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকির নাম প্রস্তাব করেছে জেন-জি বিক্ষোভকারীরা। বুধবার সভা করে এই সিদ্ধান্ত জানায় তরুণরা। এদিন সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে হয় বিশেষ এই আলোচনা। এতে অনলাইনে বিভিন্ন জেলা থেকে আন্দোলনকারী নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা যোগ দেন। সন্ধ্যা থেকে টানা ছয় ঘণ্টা ধরে চলে ম্যারাথন আলোচনা। সেখানে নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরে জেন-জি প্রতিনিধিরা। এ সময়, প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিক্ষোভকারীদের হত্যায় নির্দেশদাতাদের গ্রেফতার ও সাজার দাবি জানান তারা। জেনজির অনুরোধে দায়িত্ব নিতে সাড়া দিয়েছেন সুশিলা কারকি এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে।
নেপালে জেন জি বিক্ষোভকারীদের হামলায় আহত রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও নেপালি কংগ্রেস সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবা। মঙ্গলবার তাদের বাসভবনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করে বিক্ষোভকারীরা। দেউবা দম্পতিকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর আগে এক ভিডিওতে দেখা যায়, রাজধানীর রাস্তায় অসংখ্য বিক্ষোভকারীর হাত থেকে বাঁচতে দৌড়াচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। হঠাৎ এক তরুণ দিক পরিবর্তন করে লাফিয়ে উঠে তাকে লাথি মারলে তিনি ভারসাম্য হারিয়ে লাল দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পড়েন। তবে মুহূর্তের মধ্যে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আবার দৌড়াতে শুরু করেন।
জেন -জিদের বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেছেন। কাঠমান্ডুতে ব্যাপক সহিংস দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভের দুই দিন পর মঙ্গলবার তিনি পদত্যাগ করলেন। এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের নেপালির পার্লামেন্ট ভবনে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ওলির পদত্যাগের ঘোষণা আসলো। এর আগে উত্তেজিত জনতা একাধিক প্রভাবশালী নেতার বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। আক্রমণের শিকার হয় ওলি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবার বাসভবনও। রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়ও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এছাড়া মঙ্গলবারের বিক্ষোভে অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আরও ৯০ জন। এদিকে পদত্যাগের আগে সর্বদলীয় বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি।
তীব্র বিক্ষোভের মুখে নেপালে তুলে নেয়া হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা। যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী পৃথিবী সুবা গুরুং জানিয়ছেন, জেন জি’র আন্দোলন ও দাবির জেরে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার চালুর বিষয়ে একমত হয়েছেন মন্ত্রীরা। এর আগে, পদত্যাগ করেন নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রামেশ লেখক। মন্ত্রিসভার এক সদস্য জানিয়েছেন, বিক্ষোভ সহিংসতায় ১৯ জনের প্রাণহানি ও চার শতাধিক মানুষ আহত হওয়ায়, নৈতিক কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়েছেন রামেশ। এরও আগে, নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করা হয় গত ৪ সেপ্টেম্বর। সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ। এই আন্দোলনকে ‘জেন-জি রেভলিউশন’ নাম দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
নেপালে সামাজিকমাধ্যম বন্ধ এবং সরকারের দুর্নীতির অভিযোগে পার্লামেন্ট ভবনে প্রবেশ করে বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা বাহিনীর হামলায় বেড়ে চলেছে নিহতের সংখ্যা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত-নেপাল সীমান্তে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। ভারতীয় এসএসবি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এই সতর্কতা পূর্বসতর্কতামূলক এবং পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যেকোনো ধরনের অস্থিরতা ভারতীয় ভূখণ্ডে যাতে প্রবেশ না করতে পারে, সে বিষয়ে তারা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। এর আগে, বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় ১৯ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। সংঘর্ষের পর নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি জরুরি মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন।
সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল নেপালে এবার প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির পদত্যাগ ও আগাম নির্বাচনের দাবি তুলেছে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। এক বিবৃতিতে দলটির সেক্রেটারি কবীন্দ্র বুরলাকোতি বলেন, ‘এই বিক্ষোভ প্রমাণ করেছে যে নেপালি কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল জোট দেশ পরিচালনা করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। এই বিক্ষোভে যত খুনের ঘটনা ঘটেছে এবং এই সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর যেসব দুর্নীতি হয়েছে— সেসবের তদন্তের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করুক বিচার বিভাগ। আমরা শিক্ষার্থী-জনতাদের গুলি করে হত্যার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানাচ্ছি।’ উল্লেখ্য, কাঠমান্ডুর বাণেশ্বরসহ বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ২০ জন, আহত হয়েছেন আরও বহু সংখ্যক। নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। এবার প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিরও পদত্যাগের দাবি উঠল।
নেপালে দুর্নীতি ও সামাজিকমাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদে ‘জেনারেশন জেড’–এর নেতৃত্বে শুরু হওয়া গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে সোমবার অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া অন্তত ৩৪৭ জন আহত হয়েছেন। দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে এ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথমে কাঠমান্ডুর সংসদ ভবনের সামনে আন্দোলন শুরু হয়। বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে সরকার কারফিউ জারি করে। তবুও প্রতিবাদ থামেনি। পুলিশ জলকামান, টিয়ার গ্যাস ছাড়াও সরাসরি গুলি চালায়। ঝাপা জেলায় আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির দামাকের বাড়িতে ইটপাটকেল ছোড়ে। এ সময় পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। একাধিক জেলায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। সেনা ও পুলিশ বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন রয়েছে। তবে বিক্ষোভকারীদের ঢল সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। হাসপাতালগুলোতে একসঙ্গে শত শত আহতকে ভর্তি করায় চিকিৎসা সেবায়ও চাপ তৈরি হয়েছে।
নেপালে পর্যটনবিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে বেলুন বিস্ফোরণের ঘটনায় উপ-প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনু পৌডেলের দগ্ধের ঘটনায় এক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত কামলেশ কুমারকে বেলুনে হাইড্রোজেন গ্যাস ভর্তি করার জন্য দায়ী করা হয়েছে, যা 'ভিজিট পোখরা ইয়ার ২০২৫' অনুষ্ঠানের উদ্বোধনের সময় বিস্ফোরিত হয়। এর আগে ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্বনু একটি অনুষ্ঠানে হাইড্রোজেন গ্যাসে ফোলা বেলুন উড়িয়ে দেন। বৈদ্যুতিক সুইচ দিয়ে মোমবাতি জ্বালানোর সময় আগুনের স্পর্শ পেয়ে বেলুনগুলো বিস্ফোরিত হয়। এতে আহত হলে তাকে হেলিকপ্টারে করে কাঠমাণ্ডুতে চিকিৎসা করতে নেওয়া হয়।
গত ২৪ ঘন্টায় একনজরে ৮৩ টি নিউজ শেয়ার হয়েছে। আরো নিউজ দেখতে লগইন করুন। যেকোন সমস্যায় আমাদের ফেসবুক পেজ একনজর-এ যোগাযোগ করুন।