৭৪ বছর বয়সি গুলাম নবী বাবা প্রায় ছয় দশক ধরে কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী বহু পদের বিয়ের ভোজ ওয়াজওয়ান রান্না করছেন। ১৫ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে তিনি এই পেশায় নামেন। শ্রীনগরের পুরোনো শহরে শরৎকালে কাঠের মুগুর দিয়ে খাসির মাংস পেটানোর শব্দ বিয়ের আয়োজনের ইঙ্গিত দেয়। মধ্য এশীয় রাঁধুনিদের উত্তরসূরি বাবা এখন ভাবছেন, তাঁর পর এই রান্নার ঐতিহ্য কে ধরে রাখবে।
ওয়াজওয়ানের সূচনা চতুর্দশ শতকে, যখন মধ্য এশিয়া থেকে কাশ্মীরে আসা শাসকেরা দক্ষ রাঁধুনি নিয়ে এসেছিলেন। বাবার পূর্বপুরুষরা শ্রীনগরের পুরোনো শহরে বসতি গড়ে ওয়াজপোরা নামে রাঁধুনিদের একটি পাড়া প্রতিষ্ঠা করেন। আগে বিয়ের ভোজে সাতটি মাংসের পদ থাকলেও এখন প্রায় ২০টি পদ রান্না হয়। পদসংখ্যা ও রান্না করা মাংসের পরিমাণ পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যও প্রকাশ করতে পারে।
বাবার স্মৃতিতে, ৪০ বছর আগে উত্তর কাশ্মীরের ডেলিনা গ্রামের একটি বড় বিয়েতে তিনি ৪ হাজার ৫০০ কেজি মাংস রান্না করেছিলেন। সাধারণ বিয়েতে প্রায় ২০০ কেজি মাংস রান্না হয়। পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসেনি: হাতে মাংস নরম করা, হালকা মসলা মাখানো এবং কাঠের আগুনে ধীরে রান্না করা হয়। তাঁর ছেলে বিয়ের রান্নার বদলে রেস্তোরাঁ খুললেও আধুনিক রান্নাঘরে ওয়াজওয়ানের ঐতিহ্য বজায় রাখছেন।
প্রবীণ কাশ্মীরি রাঁধুনির উদ্বেগ, ওয়াজওয়ান বিয়ের ভোজের ঐতিহ্য কে এগিয়ে নেবে
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ের বৈসারান এলাকায় হামলার পর আরোপিত নিরাপত্তা বিধিনিষেধে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পর্যটননির্ভর মানুষের আয় ব্যাপকভাবে কমেছে। কিছু পর্যটনকেন্দ্র ধীরে ধীরে খুললেও বহু জনপ্রিয় পাহাড়ি এলাকা ও ট্রেকিং রুট এখনো বন্ধ বা সীমিত ব্যবহারের আওতায় রয়েছে। এতে মে থেকে আগস্টের প্রধান পর্যটন মৌসুম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দোকানি, ট্রেকিং গাইড, গাড়িচালক, ঘোড়ার মালিক, ছোট হোটেল ও খাবারের দোকান পরিচালনাকারীরা জানান, পর্যটকদের চলাচল সীমিত হওয়ায় তাদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গন্দরবালের নারানাগ গ্রামের দোকানি ও গাইড গুলাম কাদির জাগিলের দাবি, গত এক বছরে তার প্রায় ৬ লাখ রুপি ক্ষতি হয়েছে। ক্লিফহ্যাঙ্গার্স ইন্ডিয়ার সহ-মালিক মোহাম্মদ আদিল লাঙ্গুর ভাষ্য, বিধিনিষেধে তাদের প্রায় ২ কোটি রুপির বার্ষিক ব্যবসা কার্যত শূন্যে নেমেছে।
২০২৫-২৬ সালের জম্মু ও কাশ্মীর অর্থনৈতিক জরিপ অনুযায়ী, পর্যটন অঞ্চলটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৭ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ লাখ মানুষের জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। গন্দরবালের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাটিন কিশোর বলেছেন, নিরাপত্তার কারণে কিছু এলাকা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি নথিতে ২০২৫ সালে পর্যটক কমার কথা বলা হলেও পরে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে।
নিরাপত্তা বিধিনিষেধে কাশ্মীরের পর্যটননির্ভর মানুষের আয় ও ব্যবসা কমেছে
গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর শুনে শান্ত ও হাসিমুখে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসিত হয়েছেন এক কাশ্মীরি যুবক। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কোলে একটি শিশুকে নিয়ে তিনি সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতিকে আল্লাহর ইচ্ছা হিসেবে মেনে নিচ্ছেন; রাগ বা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন না।
তবে গাড়ি ক্ষতির ঘটনাটি বাস্তব কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। যুবকের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্যই তাকে এমন কথা বলা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মূল্যবান সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা শুনেও তিনি অভিযোগ বা বিরক্তি প্রকাশ না করে পরিস্থিতি সহজভাবে গ্রহণ করেন এবং ক্ষমাশীলতার পরিচয় দেন।
ভিডিওটি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী তার মানসিকতার প্রশংসা করেছেন। অনেকে তার প্রতিক্রিয়াকে ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা এবং আল্লাহর ওপর ভরসার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। বাস্তবে কোনো গাড়ি দুর্ঘটনা না ঘটলেও, এই সামান্য পরিস্থিতিতে তার প্রতিক্রিয়া সামনে আসায় ভিডিওটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সাজানো গাড়ি ক্ষতির খবরে শান্ত প্রতিক্রিয়ায় অনলাইনে প্রশংসিত কাশ্মীরি যুবক
শায়ের-এ-কাশ্মীর নামে পরিচিত গুলাম আহমদ মাহজুরকে কাশ্মীরি কবিতায় নতুন শৈলী, বিষয়বস্তু ও রাজনৈতিক চেতনা আনার অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি ১৮৮৭ সালের ১ আগস্ট পুলওয়ামা জেলার মিত্রিগাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পাটওয়ারি হিসেবে কাজের পাশাপাশি তিনি কাশ্মীরি, ফারসি ও উর্দুতে লিখতেন; ১৯১৮ সালে তাঁর প্রথম কাশ্মীরি কবিতা প্রকাশিত হয়।
মাহজুর স্বাধীনতা, অগ্রগতি, প্রেম, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সামাজিক সংস্কার এবং কাশ্মীরিদের দুর্দশা নিয়ে গান ও কবিতা লিখেছেন। তাঁকে কাশ্মীরি ভাষায় শিক্ষামূলক কবিতার পথিকৃৎ বলা হয়েছে এবং তাঁর যুগের বাস্তব জীবন ও সমাজকে কবিতার বিষয় করার ক্ষেত্রে তাঁকে অগ্রগণ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পুরোনো ধারা থেকে আধুনিক কাশ্মীরি কবিতায় উত্তরণে তাঁর ভূমিকার কথাও বলা হয়েছে।
তাঁর ‘Walo Ha Bagwano’ বা ‘এসো হে মালী’ কবিতাকে রাজনৈতিক ও জাগরণধর্মী রচনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে মালী সাধারণ কাশ্মীরি মানুষ ও যুবসমাজের, আর বাগান কাশ্মীরের প্রতীক। ফুল, বুলবুলি, কাঁটাঝোপ, ঝড় ও ভূমিকম্প যথাক্রমে নিপীড়িত মানুষ, স্বাধীনতার কণ্ঠ, অগ্রগতির বাধা এবং পরিবর্তন বা বিদ্রোহের ইঙ্গিত বহন করে। মাহজুর ১৯৫২ সালে ৬৭ বছর বয়সে মারা যান; তাঁকে নিয়ে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।
মাহজুরের কবিতা আধুনিক কাশ্মীরি সাহিত্য ও সামাজিক জাগরণের প্রতীক হিসেবে স্মরণীয়
বিতর্কিত জম্মু ও কাশ্মীরের মানচিত্র নিয়ে ভারতের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান। সোমবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান বলেন, ভারতের একতরফা পদক্ষেপ ও অব্যাহত দখলদারত্ব জম্মু ও কাশ্মীরের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মর্যাদা পরিবর্তন করতে পারে না। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতির জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
ভারতের ওই বিবৃতিতে বিতর্কিত জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ অঞ্চলকে ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ী প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। হায়দার খান বলেন, জাতিসংঘের মানচিত্রে জম্মু ও কাশ্মীরকে বিতর্কিত অঞ্চল হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং বর্তমান আইনগত অবস্থার ক্ষেত্রে সেই মানচিত্রই প্রাসঙ্গিক। ভারতের সরকারি মানচিত্র বা একতরফা সার্বভৌমত্বের দাবি এ ভূখণ্ডের মর্যাদায় প্রভাব ফেলবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
পাকিস্তানের মতে, কাশ্মীর বিরোধ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এজেন্ডাভুক্ত দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত আন্তর্জাতিক বিরোধগুলোর একটি। প্রাসঙ্গিক জাতিসংঘ প্রস্তাব অনুযায়ী, জনগণের অবাধ ও নিরপেক্ষ মতামতের ভিত্তিতে কাশ্মীরের চূড়ান্ত মর্যাদা নির্ধারণ হওয়া উচিত বলে দেশটি জানায়। পাকিস্তান ভারতশাসিত কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধে ভারতকে চাপ দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে।
পাকিস্তানের দাবি, ভারতের মানচিত্র কাশ্মীরের বিতর্কিত আন্তর্জাতিক মর্যাদা বদলাতে পারে না
ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সব সরকারি পাঠাগার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই এবং ডিজিটাল আর্কাইভের একযোগে অভিযান ও পূর্ণাঙ্গ অডিটের নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। ২৮ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বা সন্ত্রাসবাদে উসকানি দেয়—এমন উপাদান শনাক্ত করে বাজেয়াপ্ত করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। নির্দেশনায় সব বই, সাময়িকী, রেফারেন্স বই ও ডিজিটাল উপাদানের তালিকা যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে।
নির্দেশ অনুযায়ী, ভারতের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও অখণ্ডতার বিরুদ্ধে যায় অথবা বিচ্ছিন্নতাবাদ, সহিংসতা কিংবা চরমপন্থাকে উৎসাহিত করে—এমন উপাদান সংগ্রহ, বিতরণ বা রাখা যাবে না। সরকারি অর্থায়নের সমগ্র শিক্ষা প্রকল্পে প্রায় ২৫০টি স্কুলে বিতরণ করা দুটি বই নিয়ে বিজেপি নেতাদের আপত্তির পর অডিট শুরু হয়। সুনীল শর্মা অভিযোগ করেন, বই দুটিতে ‘ভারত অধিকৃত কাশ্মীর’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রশাসনিক প্রধান মনোজ সিনহা স্কুলশিক্ষা বিভাগের আট কর্মকর্তাকে বরখাস্ত এবং বিষয়টি ও লেখকদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। দুটি বইয়ের প্রকাশককে কালো তালিকাভুক্ত করে তাদের অন্য বইও বাজার থেকে সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় শিক্ষক, গবেষক ও বাসিন্দারা এ পদক্ষেপকে একাডেমিক স্বাধীনতা ও কাশ্মীরের ইতিহাসের জন্য হুমকি বলেছেন। মীরওয়াইজ উমর ফারুকও বই নিষিদ্ধ করে মানুষের ইতিহাস ও জীবনসংগ্রামের স্মৃতি মোছা যাবে না বলে মন্তব্য করেন।
কাশ্মীরের সরকারি পাঠাগার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই-ডিজিটাল আর্কাইভ অডিটের নির্দেশ
জম্মু, কাশ্মির ও লাদাখে মধ্যরাতে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ২ মাত্রায় ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে। শুক্রবার ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল কার্গিল। স্থানীয় সময় ভোররাত ৩টার দিকে এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। এটি ভূপৃষ্ঠের ১৫ কিলোমিটার গভীরে ছিল বলে ভারতের জাতীয় ভূকম্পন পরিমাপ কেন্দ্র ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি জানিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভূমিকম্পের জেরে এখনও পর্যন্ত কোনও প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
মধ্যরাতে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল ভারতশাসিত জম্মু-কাশ্মির
গত ২৪ ঘন্টায় একনজরে ১৫৭ টি নিউজ শেয়ার হয়েছে। আরো নিউজ দেখতে লগইন করুন। যেকোন সমস্যায় আমাদের ফেসবুক পেজ একনজর-এ যোগাযোগ করুন।
সহজে ব্যবহারের সুবিধার্থে একনজরের ওয়েব অ্যাপটি সেটাপ করে নিন।