অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি ও ফাঁড়ির সংখ্যা বেড়ে ৫৯২টিতে পৌঁছেছে এবং সেখানে ৭ লাখের বেশি ইসরাইলি বসবাস করছেন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সরকারের কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশন। ২৩ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত এই তথ্যে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ নাগাদ অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে মোট ৭ লাখ ৮০ হাজার ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৩ লাখ ৩৬ হাজার পূর্ব জেরুজালেম শহরে বাস করতেন। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের ৪২ শতাংশ এলাকা বর্তমানে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর ইসরাইল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে এবং এরপর থেকে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন দীর্ঘদিনের বিরোধের বিষয় হয়ে আছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ এসব বসতিকে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ মনে করে। কমিশন বলেছে, বসতির বিস্তার অব্যাহত থাকায় এবং অঞ্চলের বড় অংশ ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন আরও জটিল হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি কমিশনের দাবি, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি ও ফাঁড়ি বেড়ে ৫৯২টিতে পৌঁছেছে
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলি আগ্রাসন শুরুর পর গাজায় ৭৩ হাজার ৪১৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আগ্রাসনের আগে গাজার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৩ লাখ। সেই হিসাবে উপত্যকার প্রতি ৩৩ জন বাসিন্দার একজন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন এক লাখ ৭৪ হাজার ৩৬৪ জন, অর্থাৎ প্রায় প্রতি ১৪ জনে একজন।
গত বছরের ১০ অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি চললেও ইসরাইলি সেনারা স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে নিয়মিত হামলা চালিয়ে আসছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগের ৪৮ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় দুজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতির ১০ মাসে অন্তত ১ হাজার ২৮৫ ফিলিস্তিনি নিহত ও ৪ হাজার ২৫২ জন আহত হয়েছেন।
যুদ্ধবিরতির সময় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আরও ৮১৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে গাজাজুড়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা থাকা আরও অনেক লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। ইউনিসেফের হিসাবে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় ২০ হাজার ১৭৯ শিশু নিহত এবং ৪৪ হাজার ১৪৩ শিশু আহত হয়েছে।
গাজায় নিহত ৭৩ হাজার ৪১৯, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামলা চলার তথ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের
অধিকৃত পশ্চিম তীরের ই-ওয়ান এলাকায় ইসরাইলের বসতি সম্প্রসারণ পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ (এমডব্লিউএল)। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, এই পরিকল্পনা স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথকে হুমকির মুখে ফেলছে। ২২ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইল সম্প্রতি ই-ওয়ানে ১ হাজার ২৩৪টি বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে।
বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইসরাইল অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম ও মালে আদুমিমের মধ্যে একটি ধারাবাহিক ইসরাইলি বসতি করিডর গড়ে তুলতে চায়। এমডব্লিউএল ই-ওয়ান প্রকল্পকে বিপজ্জনক পরিকল্পনা হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের সব অবৈধ বসতি নীতির নিন্দা জানিয়েছে।
এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাব লঙ্ঘন করে এবং সব ধরনের শান্তি প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করে। বসতি সম্প্রসারণ নীতি ও অধিকৃত ভূখণ্ডের ভৌগোলিক এবং জনমিতিক চরিত্র পরিবর্তনের উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এমডব্লিউএল। সংস্থাটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের অধিকারের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে, দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানই ন্যায়সংগত ও স্থায়ী আঞ্চলিক শান্তির একমাত্র পথ।
ই-ওয়ান বসতি পরিকল্পনা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি এমডব্লিউএলের আহ্বান
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে ‘সবচেয়ে অনৈতিক’ সেনাবাহিনী বলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ক্ষমতাসীনরা ভুক্তভোগীদের দেখতে বা তাদের জীবন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করতে অস্বীকার করছেন।
আলবানিজের পোস্টের সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিনে এক ফিলিস্তিনির নিহত হওয়ার বিষয়ে অন্য একটি পোস্টের ছবি যুক্ত ছিল। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার তথ্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তি ফাতহি খাজেম। শুক্রবার জেনিনে নিজ বাড়িতে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে তিনি নিহত হন।
ওয়াফা জানায়, ইসরাইলি বাহিনী তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করলে তিনি প্রতিরোধ করেন এবং এ সময় তাকে গুলি করা হয়। গুলিবিদ্ধ খাজেমকে উদ্ধারে একটি অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে যেতে চাইলেও ইসরাইলি সেনারা বাধা দেয় বলে সংস্থাটি জানায়। পরে তাকে রক্তক্ষরণে মারা যেতে দেওয়া হয় এবং সেনারা তার লাশ নিয়ে যায় বলে ওয়াফার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আলবানিজ এসব ঘটনাকে ফিলিস্তিনিদের জীবন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে তুলে ধরেন।
জেনিনে ফাতহি খাজেম নিহতের পর ইসরাইলি সেনাবাহিনীর নিন্দা জাতিসংঘ প্রতিবেদকের
২২ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গাজায় হামাস সামরিক, সাংগঠনিক ও প্রশাসনিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়লেও সংগঠনটি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরাইলের সঙ্গে অস্ত্রবিরতি চুক্তির পর হামাস প্রকাশ্য প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তর করেছে এবং সরকারি কমিটিগুলো বিলুপ্ত করেছে। অস্ত্র সমর্পণ নিয়ে আলোচনা চললেও সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরাইলের সামরিক অভিযানে হামাসের বহু জ্যেষ্ঠ নেতা, সামরিক কমান্ডার ও শত শত যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। গাজার ব্যাপক ধ্বংসের মধ্যে সংগঠনটির শাসনক্ষমতা কমেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আংশিক সামরিক পরাজয় বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হারানো কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের সমাপ্তি বোঝায় না।
বন্দিবিনিময়, যুদ্ধবিরতি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় হামাস এখনো প্রাসঙ্গিক বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গাজায় হামাসবিরোধী ক্ষোভ ও সমালোচনার কথাও এতে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হামাস রূপান্তরের পর্যায়ে রয়েছে এবং গাজায় ইসরাইলি সেনা থাকা পর্যন্ত তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হামাস দুর্বল হলেও গাজার ভবিষ্যৎ সমীকরণে এখনো প্রাসঙ্গিক
জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় বলেছে, গাজায় ফিলিস্তিনিদের হত্যায় ইসরাইলি বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলা যুদ্ধাপরাধ ও অন্যান্য নৃশংস অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংস্থাটির কার্যালয় শুক্রবারের বিবৃতিতে গাজার পুলিশ সদস্য ও স্থাপনায় ধারাবাহিক ইসরাইলি হামলা নিয়েও উদ্বেগ জানায়। হামলার সংখ্যা কখনও কমলেও উপত্যকাটির বেসামরিক মানুষ নিয়মিত, অনিশ্চিত ও প্রাণঘাতী হামলার ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে বিবৃতিতে বলা হয়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ থেকে ১৯ আগস্টের মধ্যে গাজায় অন্তত ২২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে। বিবৃতিতে বুধবার গাজা সিটির পৌর পুলিশের সদর দপ্তরে ইসরাইলি হামলার কথাও উল্লেখ করা হয়। ওই হামলায় আট পুলিশ কর্মকর্তা এবং ১৩ বছর বয়সি এক কিশোরী নিহত হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গাজাজুড়ে পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ১৮টি ইসরাইলি হামলা নথিভুক্ত করেছে কার্যালয়টি। এসব ঘটনায় ৭৭ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ছয় শিশু ও চার নারী রয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে পুলিশ সদস্যরা বেসামরিক সুরক্ষা পান, যদি না তারা সরাসরি ও সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নেন। কার্যালয়ের প্রধান আজিত সুনঘাই হামলাগুলোর সামরিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
গাজায় পুলিশ ও বেসামরিকদের ওপর হামলা যুদ্ধাপরাধ হতে পারে বলল জাতিসংঘ
অধিকৃত পশ্চিম তীরের কুসরা এলাকায় একটি বাড়ি থেকে মালপত্র ছুড়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে ইসরাইলি সেনাদের বিরুদ্ধে। আমার দেশের উদ্ধৃত রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে কয়েকজন সেনাকে বাড়ির বারান্দা থেকে বিভিন্ন জিনিস নিচে ফেলতে দেখা গেছে। বাড়ির বাইরে থাকা একটি কূপেও কিছু সামগ্রী নিক্ষেপের দৃশ্য দেখা যায়। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ২১ আগস্ট ২০২৬।
ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লুই রিদি বলেন, বাড়িগুলোর একটি তার ভাই রায়েদ রিদির। পরিবারের বাড়িটি এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের ঘেরাওয়ের মধ্যে থাকায় তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে কুসরায় ফিরেছেন। কয়েকটি ফিলিস্তিনি বাড়ির আশপাশে বসতি স্থাপনকারীদের অবস্থানের কারণে বাসিন্দাদের চলাচল ও দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, কুসরার কয়েকটি বাড়ি ঘিরে বসতি স্থাপনকারীদের অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন মহল উদ্বেগ জানিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইসরাইলি সেনা মোতায়েন থাকলেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বলেছে, ভিডিওতে দেখা ঘটনাগুলো তারা পরীক্ষা করছে। লুই রিদি আগে ছাদে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা তুলেছিলেন; পরে তার জমিতে প্রবেশ করা এক বসতি স্থাপনকারীর সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা হয়।
কুসরার ফিলিস্তিনি বাড়ির ভিডিওর ঘটনা পরীক্ষা করছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী
অধিকৃত পশ্চিম তীরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ই-১ এলাকায় এক হাজার ২০০টির বেশি বসতি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করেছে ইসরাইল। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও কানাডা যৌথ বিবৃতিতে এ সিদ্ধান্তে তীব্র উদ্বেগ জানিয়ে একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেছে এবং অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। ইসরাইলের আবাসন মন্ত্রণালয় বুধবার এক হাজার ২৩৪টি বসতির জন্য টেন্ডার প্রকাশ করে।
তিন হাজার ৪০১টি অনুমোদিত আবাসন ইউনিটের মধ্যে এই টেন্ডার প্রকাশ করা হয়েছে। ই-১ এলাকা পূর্ব জেরুজালেম ও ইসরাইলি বসতি মালে আদুমিমের মাঝখানে প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটারজুড়ে অবস্থিত। দরপত্র জমার শেষ সময় ১৯ অক্টোবর, যা ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, ই-১ প্রকল্প ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ‘অস্তিত্বের হুমকি’ সৃষ্টি করছে।
ফিলিস্তিনিদের আশঙ্কা, এ নির্মাণ পশ্চিম তীরকে কার্যত উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত করবে এবং পূর্ব জেরুজালেমকে বিচ্ছিন্ন করবে। ফিলিস্তিনি ও প্রকল্পবিরোধীদের মতে, এতে পশ্চিম তীরের দুই অংশের সরাসরি যোগাযোগ ব্যাহত হবে। রামাল্লাহ, পূর্ব জেরুজালেম ও বেথলেহেমকে যুক্ত করে ধারাবাহিক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গড়াও কঠিন হবে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ১৬০টি ইসরাইলি বসতিতে সাত লাখ ইহুদি বসবাস করছেন।
ই-১ বসতি নির্মাণের টেন্ডার প্রত্যাহারে ইসরাইলকে পাঁচ পশ্চিমা দেশের আহ্বান
অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণ হেবরন এলাকায় ২০ আগস্ট ২০২৬ ভোররাতে এক ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সশস্ত্র ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে। ফিলিস্তিনি গণমাধ্যম জানিয়েছে, হামলার সময় পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে ছিলেন। বাড়ির মালিক মোহাম্মদ আল-নাওয়াজা ওয়াফা বার্তা সংস্থাকে বলেন, পাঁচজন সশস্ত্র ও মুখোশধারী বসতি স্থাপনকারী বাড়িটিতে হামলা চালায়।
আল-নাওয়াজার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের একজন জানালার কাচ ভেঙে ঘরের ভেতরে দাহ্য পদার্থ ছুড়ে দেয়, এতে আগুন ধরে যায়। ফিলিস্তিনি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিকটবর্তী অবৈধ ইসরাইলি বসতি ওতনিয়েল থেকে আসা বসতি স্থাপনকারীরা এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে।
এদিকে, পশ্চিম তীরের দক্ষিণ নাবলুসের কুসরা গ্রামে কয়েকটি ফিলিস্তিনি বাড়ি ঘিরে বসতি স্থাপনকারীদের অবরোধ ১২তম দিনে পৌঁছেছে। গ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল আজিম ওয়াদি বলেন, তিনটি বাড়ি এখনো অবরুদ্ধ এবং বাসিন্দারা ঢুকতে বা বের হতে পারছেন না। তিনি অভিযোগ করেন, ইসরাইলি সেনারা বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষা দিচ্ছে এবং একটি বাড়িকে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। ওয়াফা জানিয়েছে, অবরুদ্ধ পরিবারগুলো খাদ্য ও ওষুধের সংকটে রয়েছে।
দক্ষিণ হেবরনে বাড়িতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ, কুসরায় অবরোধে খাদ্য ও ওষুধ সংকট
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ১০৭টি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি এ তথ্য জানায়। একই সময়ে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণও নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংস্থাটি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। এইচআরডব্লিউর ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলায় জড়িত বসতি স্থাপনকারীরা ইসরাইলি রাষ্ট্রের আর্থিক, সামরিক ও আইনি সহায়তা পেয়ে থাকে। সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরা কখনও ইসরাইলি সেনাদের সঙ্গে হামলা চালায়; আবার কিছু ঘটনায় সেনারা উপস্থিত থাকলেও হামলা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় না।
ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ এবং অবৈধ ইসরাইলি বসতির সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছে। ইসরাইলের সঙ্গে বিদ্যমান বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি স্থগিতের বিষয়টিও বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ১০৭ ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় বাস্তুচ্যুত: এইচআরডব্লিউ
ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য ইসরাইল একটি স্থাপনা নির্মাণ শুরু করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ২০ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত এ খবরের পর আরব লীগ উদ্যোগটির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর জন্য আন্তর্জাতিক জবাবদিহি প্রয়োজন হবে।
বিবৃতিতে আরব লীগ এ পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনি বন্দিদের অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক ও নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন ও এর প্রোটোকল এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির লঙ্ঘন। এসব আইনে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বন্দিদের সুরক্ষা এবং অমানবিক বা স্বেচ্ছাচারী আচরণ থেকে রক্ষার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
আরব লীগ বলেছে, গত মার্চে নেসেটে ‘সন্ত্রাসবাদ’সংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ সম্প্রসারণের আইন পাস এবং এখন অবকাঠামো তৈরির প্রস্তুতি একটি পদ্ধতিগত নীতির অংশ। মানবাধিকার সংগঠনগুলো আইনটি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলকভাবে প্রয়োগের আশঙ্কা করেছিল। ইসরাইলি কারাগারে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন; তাদের অনেককে বিচার ছাড়াই প্রশাসনিক আটকাদেশে রাখা হয়েছে, যা অধিকার সংগঠনগুলো স্বেচ্ছাচারী ও অন্যায্য বলে সমালোচনা করে আসছে।
ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে তা যুদ্ধাপরাধ হবে বলে সতর্ক করেছে আরব লীগ
গাজায় পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজব হত্যাকাণ্ডে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর তদন্ত প্রত্যাখ্যান করেছে তার পরিবার এবং স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে। আনাদোলুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হিন্দের দাদি এ দাবি জানান। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী প্রথমবার স্বীকার করেছে যে, হিন্দকে বহনকারী গাড়িটিতে সেনারা গুলি চালিয়েছিল। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে ২০ আগস্ট ২০২৬।
হিন্দের দাদি বলেন, ইসরাইলি তদন্ত কিংবা দেশটির বিচারব্যবস্থার ওপর পরিবারের কোনো আস্থা নেই। তিনি বলেন, তারা শুধু গাজার শিশু হিসেবে হিন্দের জন্য নয়, গাজায় নিহত সব শিশু শহীদের পক্ষ থেকে বিচার চান। এ ঘটনায় হিন্দের ছয় স্বজন এবং তাকে উদ্ধার করতে যাওয়া ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্টের দুই চিকিৎসাকর্মীও নিহত হন।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গাজা নগরী থেকে গাড়িতে পালানোর সময় হিন্দ সাত সদস্যের একটি পরিবারের সঙ্গে ছিলেন। হামলায় গাড়িতে থাকা তার চাচা, চাচি ও তিন চাচাতো ভাইবোন নিহত হন। গাড়িতে আটকা পড়ে শিশুটি ফোন করেছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়; পরে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে সেও নিহত হয়। সাহায্য করতে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্সের দুই কর্মীকেও হত্যা করা হয়। ঘটনার দিন সেখানে সেনা ছিল না বলে আগে দাবি করেছিল ইসরাইল।
হিন্দ রজবের পরিবার ইসরাইলি তদন্ত প্রত্যাখ্যান করে আন্তর্জাতিক তদন্ত চেয়েছে
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানবিক সহায়তাকর্মীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী স্থান ছিল ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। টানা তৃতীয় বছরের মতো এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে গাজা, যেখানে ওই বছরে ১৮৬ জন ত্রাণকর্মী নিহত হয়েছেন। চলমান সংঘাতের মধ্যে ৭১ জন ত্রাণকর্মী নিহত হওয়ায় সুদান ছিল দ্বিতীয় সবচেয়ে প্রাণঘাতী দেশ।
জাতিসংঘের তথ্য ও এইড ওয়ার্কার সিকিউরিটি ডাটাবেসের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ৯০৭ জন ত্রাণকর্মী নিহত, আহত বা অপহৃত হয়েছেন। ২০২৪ সালে এ সম্মিলিত সংখ্যা ছিল ৮৩৩, ফলে ২০২৫ সালে নতুন রেকর্ড হয়েছে। ২০২৫ সালে নিহত হন ৩৫০ জন, যা আগের বছরের ৩৮৭ জনের চেয়ে কম। জাতিসংঘের পৃথক এক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে অন্তত ৩২৬ জন নিহত এবং তিন বছরে এক হাজারের বেশি মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে।
জাতিসংঘ বলছে, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সস্তা ও সহজলভ্য সশস্ত্র ড্রোনের ব্যবহার বাড়ায় ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলা বাড়ছে। মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সহিংসতাকে ভয়াবহ আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মানা ও হামলাকারীদের জবাবদিহির আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ৮২ জন নিহত, ৯৭ জন আহত এবং ৩৯ জন অপহৃত হয়েছেন।
জাতিসংঘের তথ্যে ২০২৫ সালে ত্রাণকর্মীদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী ছিল গাজা
অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেরুজালেম এবং ইসরাইলের লিদ্দা শহরে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে উচ্ছেদ নির্দেশ জারির অভিযোগ উঠেছে। ১৭ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত সিলওয়ানে মারাগা পরিবারের মালিকানাধীন তিনটি বাড়ি উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা ওয়াফার তথ্য অনুযায়ী, জোরপূর্বক উচ্ছেদের হুমকিতে থাকা ওই বাড়িগুলোর আশপাশে ইসরাইলি বাহিনী অভিযান চালিয়েছে। একই সময়ে দখলদার বাহিনী বেথলেহেমের পূর্বে আল শাওয়ারা ও জা’আতরা শহরে রাতভর অভিযান পরিচালনা করে। মারাগা পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, তারা কয়েক দশক ধরে এসব বাড়িতে বসবাস করছেন।
ওয়াফা আরও জানায়, লিদ্দায় ৭০টির বেশি ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব পরিবারের দাবি, ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগ থেকেই তারা ওই বাড়িগুলোতে বসবাস করে আসছেন এবং এখন ইসরাইল তাদের জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। পরিবারগুলো জানিয়েছে, তারা কোনো অবস্থাতেই নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে রাজি নয়।
জেরুজালেম ও লিদ্দায় ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে উচ্ছেদ নির্দেশের অভিযোগ
পোপ লিও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। উগ্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও সহিংসতা বৃদ্ধির মধ্যে রোববার রোমের বাইরে ক্যাস্তেল গান্দোলফোতে দুপুরের প্রার্থনা শেষে তিনি এ বক্তব্য দেন। তিনি পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনগণের ওপর বারবার চালানো সহিংসতা বন্ধে তাঁর আবেদন পুনর্ব্যক্ত করেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ঘিরে ফেলেছে। সংস্থাগুলো এটিকে ফিলিস্তিনিদের আরও ভূমি দখল করে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে। পোপ লিও ন্যায্য ও স্থায়ী শান্তির জন্য দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জরুরিভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
ভ্যাটিকান দীর্ঘদিন ধরে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে সমর্থন করে আসছে; গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম এর অন্তর্ভুক্ত। নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট সরকার পশ্চিম তীরে ব্যাপক বসতি নির্মাণ তদারকি করছে। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ বলেছেন, এই নির্মাণের লক্ষ্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে কবর দেওয়া। জাতিসংঘ ও অধিকাংশ সরকার বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ মনে করে, যদিও ইসরায়েল অঞ্চলটিকে বিতর্কিত বলে দাবি করে।
পোপ লিও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা বন্ধ ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন
পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকা ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত করার বিষয়ে তেল আবিবের পদক্ষেপে সৃষ্ট ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসি। ১৫ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইল পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকা দখলে নিচ্ছে।
৫৭ সদস্যের ওআইসি এক বিবৃতিতে ইসরাইলি দখলদারিত্ব ও ঔপনিবেশিক বসতি স্থাপনের উদ্যোগকে অবৈধ বলেছে। সংস্থাটির মতে, এসব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত সব পদক্ষেপ, সত্তা ও প্রতিষ্ঠানও অবৈধ।
ওআইসি বলেছে, ইসরাইলের এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক বৈধতার প্রাসঙ্গিক প্রস্তাবনা এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের পরামর্শমূলক মতামতের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ফিলিস্তিনে হত্যা, বসতি স্থাপন, সংযুক্তিকরণ, পরিকল্পিত সন্ত্রাসবাদ, অবরোধ ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত বন্ধে ইসরাইলের ওপর চাপ দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
পশ্চিম তীর সংযুক্তির পদক্ষেপ নিয়ে ইসরাইলকে সতর্ক করল ওআইসি
অধিকৃত পশ্চিম তীরের আল-কুসরা গ্রামে ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের কয়েকটি ফিলিস্তিনি বাড়ি দখল এবং বেসামরিকদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় ফ্রান্স তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ১৪ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিবৃতি দেয়।
ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষকে এসব কর্মকাণ্ডের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের সুরক্ষায় সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
ফ্রান্স ইসরাইলি বসতি স্থাপন নীতির নিন্দা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে, এটি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনি ও তাদের সম্পত্তির ওপর হামলা বেড়েছে; জমি ও বাড়ি দখল এবং বাসিন্দাদের বাস্তুচ্যুতির ঘটনা নিয়ে ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো সতর্ক করেছে।
আল-কুসরায় ফিলিস্তিনি বাড়ি দখল ও সহিংসতার ঘটনায় ফ্রান্সের তীব্র নিন্দা
গাজা থেকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহার ছাড়া হামাসকে নিরস্ত্র করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন অধিকাংশ ফিলিস্তিনি। ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চের নতুন জনমত জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি ১৪ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত হয়।
জরিপে অংশ নেওয়া অনেকের মতে, ইসরাইলি দখল ও সামরিক উপস্থিতি চলমান থাকলে হামাসের অস্ত্র সমর্পণ গ্রহণযোগ্য নয়। পশ্চিম তীরে ৭৮ শতাংশ উত্তরদাতা নিরস্ত্রীকরণের বিরোধিতা করেছেন, আর গাজায় এ হার ৫৫ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে ৬৯ শতাংশ ফিলিস্তিনি যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের শর্ত হিসেবেও হামাসের নিরস্ত্রীকরণের বিপক্ষে মত দিয়েছেন।
জরিপে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও গাজার শাসনব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। অধিকাংশ উত্তরদাতা মনে করেন না যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় পাঁচ বছরের মধ্যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। হামাসও বলেছে, গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা ছাড়া অস্ত্র সমর্পণ নিয়ে আলোচনা করতে তারা রাজি নয়।
পূর্ণ ইসরাইলি প্রত্যাহার ছাড়া হামাস নিরস্ত্রীকরণে ফিলিস্তিনিদের সংখ্যাগরিষ্ঠের আপত্তি
ফিলিস্তিনি ডিজিটাল অধিকার সংগঠন ৭ আমলেহ ইউট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা দলের সঙ্গে তৈরি প্রতিবেদনে অভিযোগ করেছে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিক মেটা ফিলিস্তিনপন্থি সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও প্রতিষ্ঠানের পোস্টের প্রচার কমাচ্ছে, অ্যাকাউন্ট স্থগিত করছে এবং লাইভ সম্প্রচারে সীমা আরোপ করছে। ১৩ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দ্য প্ল্যাটফর্মসাইড অব প্যালেস্টাইন ২০২১–২০২৫’ শীর্ষক গবেষণাটি ৭ওআর ব্যবস্থায় নথিভুক্ত ৩ হাজার ৫০০টির বেশি যাচাই করা ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে।
গবেষকদের ভাষ্য, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত ভুল নয়; বরং ফিলিস্তিনিদের ডিজিটাল উপস্থিতি, দৃশ্যমানতা ও অংশগ্রহণ সীমিত হওয়ার একটি কাঠামোগত প্রবণতা। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নথিভুক্ত ঘটনার মাত্র ৩২ দশমিক ৫ শতাংশে নির্দিষ্ট নীতিমালা লঙ্ঘনের কারণ উল্লেখ ছিল। কারণ শনাক্ত হওয়া ঘটনার ৫৭ দশমিক ২ শতাংশে মেটার ডেঞ্জারাস অর্গানাইজেশনস অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়ালস নীতির উল্লেখ পাওয়া যায়; সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে হারটি ৭১ দশমিক ১ শতাংশ।
মেটা বলেছে, অভিযোগ করা কনটেন্ট আরবি উপভাষা বোঝেন এমন মডারেটরদের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক বক্তব্যের সুযোগ বাড়াতে নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে ৭ আমলেহ পাঁচ বছরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের পক্ষে করা ২ হাজার ৮২৮টি আপিলের প্রায় অর্ধেকের কোনো জবাব পায়নি। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, গাজার ভিডিও ও সাক্ষ্য মুছে গেলে ভবিষ্যৎ যুদ্ধাপরাধ তদন্তের সম্ভাব্য প্রমাণও হারিয়ে যেতে পারে।
৭ আমলেহর প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনপন্থি কনটেন্টে মেটার বিধিনিষেধের অভিযোগ
নিহত ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের স্মৃতি সংরক্ষণে একটি নতুন মৌখিক ইতিহাস প্রকল্প শুরু হয়েছে। সহকর্মী, বন্ধু ও স্বজনদের পাঠানো ভয়েস নোটের মাধ্যমে এতে সাংবাদিকদের জীবন, কাজ, স্বপ্ন ও সংগ্রামের গল্প তুলে ধরা হচ্ছে। ১৩ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় দীর্ঘ যুদ্ধ ও হামলার মধ্যে নিহত সংবাদকর্মীদের শুধু নাম বা সংখ্যার তালিকায় সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যক্তি হিসেবে স্মরণ করাই উদ্যোগটির লক্ষ্য।
সংগৃহীত কণ্ঠস্মৃতিতে নিহতদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং সাংবাদিকতার প্রতি তাঁদের অঙ্গীকারের কথা উঠে আসছে। গাজার সাংবাদিকরা যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের খবর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বের সামনে আনতেন। তাঁদের অনেকেই একই সঙ্গে সংবাদকর্মী এবং যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী ছিলেন; সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি পরিবার, ঘরবাড়ি ও স্বজনদের নিরাপত্তা সংকটও মোকাবিলা করেছেন।
আয়োজকদের আশা, এসব রেকর্ড ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকতার ইতিহাস এবং গাজা যুদ্ধের মানবিক বাস্তবতা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হবে। লিখিত জীবনী বা আনুষ্ঠানিক স্মৃতিচারণের বদলে কাছের মানুষদের কণ্ঠে হাসি-কান্না ও কাজের অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ প্রকল্পটির বিশেষত্ব। ফিলিস্তিনে ব্যক্তিগত সাক্ষ্য ও রেকর্ড করা স্মৃতিচারণ আগে থেকেই অভিজ্ঞতা সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ভয়েস নোটে নিহত ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের জীবন, কাজ ও স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ
গত ২৪ ঘন্টায় একনজরে ১১৪ টি নিউজ শেয়ার হয়েছে। আরো নিউজ দেখতে লগইন করুন। যেকোন সমস্যায় আমাদের ফেসবুক পেজ একনজর-এ যোগাযোগ করুন।
সহজে ব্যবহারের সুবিধার্থে একনজরের ওয়েব অ্যাপটি সেটাপ করে নিন।