হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প কৌশল হিসেবে ওমান উপসাগরে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর বেড়েছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাংকারট্র্যাকার্স ডটকম সেখানে অন্তত ২০ দফা শিপ-টু-শিপ বা এসটিএস স্থানান্তর শনাক্ত করেছে। এক দিনে এটি ওই এলাকার ব্যস্ততম এসটিএস কার্যক্রমগুলোর অন্যতম বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এসটিএস পদ্ধতিতে সমুদ্রে একটি জাহাজ থেকে সরাসরি অন্য জাহাজে তেল বা জ্বালানি পণ্য সরানো হয়। পণ্যের উৎস আড়াল করা, নিষেধাজ্ঞা এড়ানো অথবা ঝুঁকিপূর্ণ বন্দরে না গিয়েই পণ্য পরিবহনের জন্য এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এক্সে দেওয়া পোস্টে ট্যাংকারট্র্যাকার্স ডটকম জানায়, তারা প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের চলাচল শনাক্ত করেছে।
এর পাশাপাশি বিভিন্ন পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যও ছিল। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এসব পণ্যের উৎস ছিল অঞ্চলটির প্রায় সব দেশ, তবে ইরান এর বাইরে ছিল। পরে আরও পাঁচটি এসটিএস স্থানান্তর শনাক্ত করা হয়, যার একটিতে ইরানের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি ছিল। হরমুজ ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে ওমান উপসাগর গুরুত্বপূর্ণ স্থানান্তরকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
হরমুজ এড়িয়ে ওমান উপসাগরে জাহাজে জাহাজে তেল স্থানান্তর বেড়েছে
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ অচলাবস্থার দিকে যেতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো। ৪ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা সংঘাত দ্রুত শেষ করে একটি ইতিবাচক সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানাচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।
ওয়াশিংটন থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক রোজিল্যান্ড জর্ডান জানান, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট অন্তত তিন বা চারবার এমন বক্তব্য দিয়েছেন, যা অনেকের কাছে আলটিমেটামের মতো মনে হয়েছে। ইরানের নেতৃত্ব সৎভাবে কাজ করছে না বা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না—এমন মন্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। ইরানের জনগণের ওপর ‘নরক ও ধ্বংস’ নেমে আসতে পারে বলেও কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে হুমকিমূলক বক্তব্যের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দুই দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে উত্তেজনা কমানোর উপায় খুঁজছেন। জর্ডান বলেন, পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। আঞ্চলিক দেশগুলোর মতে, নাগরিকদের স্বার্থের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য যুদ্ধের দ্রুত অবসান জরুরি।
ইরানকে ঘিরে সংঘাত দ্রুত শেষ করে ইতিবাচক সমাধানের আহ্বান উপসাগরীয় দেশগুলোর
উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা কৌশলে বড় পরিবর্তন এনেছে। এশিয়া গ্রুপের জিসিসি বিষয়ক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ হেলাল একে ‘কৌশলগত অনিবার্যতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি আল জাজিরাকে জানান, কাতার এখন আর প্রথাগত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নেই, কারণ দেশটি নিজেই হামলার শিকার হয়েছে এবং বাইরের শক্তির সহায়তা চেয়েছে। বর্তমানে এই অঞ্চলের প্রধান লক্ষ্য হলো শত্রুতা কমানো এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন অংশীদারিত্বে এগিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছেন, যেখানে ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি ও যুদ্ধ অভিজ্ঞতা বিনিময় সংক্রান্ত একাধিক চুক্তি হয়েছে। হেলালের মতে, ওয়াশিংটন থেকে সিউল পর্যন্ত সব দেশের জন্য এখন উপসাগরীয় প্রতিরক্ষা বাজার উন্মুক্ত।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার ইন্টারসেপ্টর প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের তুলনায় সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক। এতে বোঝা যায়, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর না করে প্রতিরক্ষা উৎসে বৈচিত্র্য আনছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা কৌশলে পরিবর্তন, নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে উঠছে
গত ২৪ ঘণ্টায় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর একাধিক হামলা হয়েছে, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ে। এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়াম জানিয়েছে, আবুধাবিতে তাদের প্রধান কারখানায় হামলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অ্যালুমিনিয়াম বাহরাইনেও হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রাডার ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই হামলাগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ফলে দেশগুলো ভবিষ্যতের যেকোনো শান্তি আলোচনায় নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে বলে সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউএই ও বাহরাইনের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত
সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও বিভিন্ন স্থাপনায় এসব হামলার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে হামলাকে ‘মহিমান্বিত’ করা বা জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির অভিযোগ আনা হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের ফেলো সুলতান আল-আমের বলেন, এই দমন-পীড়নের পেছনে দুটি কারণ রয়েছে—ইরানের গোয়েন্দারা এসব ভিডিও ব্যবহার করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শনাক্ত করতে পারে এবং উপসাগরীয় শহরগুলোর নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভাবমূর্তি রক্ষা করা। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের কাছে নিজেদের আকর্ষণীয় হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
আমিরাতের জাতীয় গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষের প্রধান আবদুল্লাহ আল-হামেদ সতর্ক করে বলেন, একটি ছবি আতঙ্ক ছড়াতে পারে এবং ভুল তথ্য সমাজকে অস্থির করতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রও নিজ দেশের সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
ইরানি হামলার ভিডিও পোস্টে উপসাগরীয় দেশগুলোর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও গ্রেপ্তার
উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, কারণ কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সম্ভাব্য বা চলমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে দ্রুত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে পড়ছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অতিরিক্ত ব্যবহারে মজুদ কমে আসছে, আর এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যয়বহুল ও পুনরায় সরবরাহে সময়সাপেক্ষ হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে।
কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রনির্মিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হিসেবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার পর তাদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের সমন্বিত হামলার কৌশল প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে।
কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে যে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াতে পারে যাতে ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয় বা দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা হয়।
ইরান উত্তেজনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর ইন্টারসেপ্টর সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ
গত ২৪ ঘন্টায় একনজরে ২২৯ টি নিউজ শেয়ার হয়েছে। আরো নিউজ দেখতে লগইন করুন। যেকোন সমস্যায় আমাদের ফেসবুক পেজ একনজর-এ যোগাযোগ করুন।
সহজে ব্যবহারের সুবিধার্থে একনজরের ওয়েব অ্যাপটি সেটাপ করে নিন।