প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস জানিয়েছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার একে একে আবিষ্কার করেছে দুর্নীতি ও জনগণের সম্পদ চুরি কীভাবে ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছিল এবং তার ফলশ্রুতিতে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভয়ানকভাবে নাজুক ও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এর অবসান ঘটাচ্ছে। আর কখনোই উন্নয়নকে যেন জনগণের সম্পদ আত্মসাতের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা না যায়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা আরো বলেন, দেশের নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মজবুত করতে আমরা সংস্কারমূলক কিছু কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্কার হলো রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাপনার সংস্কার— যেখানে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সংস্থাকে পৃথক করার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পাবে। ইউনূস বলেন, বিগত দেড় দশকের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি যে জবাবদিহিতা ছাড়া যেকোনও উন্নয়ন ক্ষণস্থায়ী ও ভঙ্গুর। রাজনৈতিক হীনস্বার্থ ও দুর্নীতির উদ্দেশ্যে গৃহীত অবকাঠামো প্রকল্প শুধু যে অর্থনীতির ওপরই চাপ বাড়ায় তা নয়, তা জনগণের কোনও কল্যাণও করে না। বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা কেবল উন্নয়ন নয়; বরং জবাবদিহিতামূলক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। আর সেই লক্ষ্যেই সরকার কঠিন সংস্কার যাত্রা অব্যাহত রেখেছে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেছেন, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্বি রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এখনই বাস্তবায়ন করতে হবে। জাতিসংঘে ইউনূস বলেন, আজ আমি সতর্ক করছি—চরম জাতীয়তাবাদ, অন্যের ক্ষতি হয় এমন ভূরাজনীতি, এবং অন্যের দুর্ভোগ ও পীড়নের প্রতি ঔদাসীন্য বহু দশকের পরিশ্রমে আমরা যে অগ্রগতি অর্জন করেছি তা ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর সবচেয়ে মর্মান্তিক চিত্র আমরা দেখছি গাজায়। শিশুরা না খেয়ে অকাল মৃত্যুবরণ করছে, বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে, হাসপাতাল, স্কুলসহ একটি গোটা জনপদ নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হচ্ছে। জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সঙ্গে আমরাও একমত যে আমাদের চোখের সামনেই একটি নির্বিচার গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে; আমাদের দুর্ভাগ্য যে মানবজাতির পক্ষ থেকে এর অবসানে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি না। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের একটি শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে—যেখানে সর্বস্তরে সহনশীলতা, অহিংসা, সংলাপ ও সহযোগিতার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত করা হবে। ইউনূস বলেন, দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বহুভাষিকতাকে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করে, কারণ আমরা বিশ্বাস করি যে, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, পারস্পরিক বোঝাপড়াকে আরও গভীর করে। একবিংশ শতাব্দীতে কোনো সমাজেই ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা, বর্ণবাদ, বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষ বা ইসলামবিদ্বেষের কোনো স্থান নেই। গত বছর বাংলাদেশে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়ানো হয়েছে, যা এখনো চলমান রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিকল্পিত মিথ্যা সংবাদ ও ‘ডিপফেক’-এর প্রসার, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এসবের বিরুদ্ধে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ আর কখনও স্বৈরশাসনের পথে ফিরবে না। দলমত নির্বিশেষে গঠিত ঐকমত্যের ভিত্তিতেই দেশের গণতন্ত্র ও সংস্কার কার্যক্রম টেকসইভাবে এগিয়ে যাবে। জনগণের আত্মত্যাগে অর্জিত ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে আর কোনও শক্তি বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। প্রধান উপদেষ্টা জানান, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে নাগরিকবান্ধব সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। আগামী নির্বাচনে যে দলই জনগণের সমর্থন পাক না কেন, সংস্কার বাস্তবায়নে কোনও অনিশ্চয়তা থাকবে না। বাংলাদেশের গণতন্ত্র আর কখনও হুমকির মুখে পড়বে না।
জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। প্রেস উইং বলছে, প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘের সদর দফতরে সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন, জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এবং আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। এর আগে, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস উরুগুয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিও লুবেটকিন এবং চিলির সাবেক রাষ্ট্রপতি মিশেল ব্যাচেলেটের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এদিকে, উদ্বোধনী অধিবেশন শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া নৈশভোজেও অংশ নেবেন প্রধান উপদেষ্টা।
আজ থেকে শুরু হচ্ছে জাতিংসঘের ৮০তম সাধারণ অধিবেশনের মূল পর্ব। আগামী শনিবার পর্যন্ত পর্যন্ত চলবে বিশ্বনেতাদের বিতর্ক পর্ব। উদ্বোধনী বক্তব্যের পর রীতি মেনে অধিবেশনের প্রথম দেশ হিসেবে বক্তব্য রাখবে ব্রাজিল। পর্যায়ক্রমে ভাষণ দেবেন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের নেতারা। এবারের অধিবেশনের সভাপতিত্ব করছেন জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যানালিনা বেয়ারবক। অংশ নিচ্ছেন বিশ্বের ১৪০টি দেশের রাষ্ট্র-সরকারপ্রধানসহ প্রতিনিধিরা। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াই এবারের অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। মূলপর্বে প্রাধান্য পাবে টেকসই উন্নয়ন, জ্বালানি সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্দা নামবে এবারের অধিবেশনের।
১৯৬৭ সালের পর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যোগ দিতে ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন। সিরিয়া টিভি জানিয়েছে, আল-শারার সঙ্গে চারজন মন্ত্রী রয়েছেন। এই সফরে সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে-যার মধ্যে ওয়াশিংটনে দূতাবাস পুনরায় চালু করাও অন্তর্ভুক্ত। ২৪ সেপ্টেম্বর আল-শারা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন। অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সিরিয়ার নেতার মধ্যে একটি বৈঠকের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। রয়টার্স বলছে, আল কায়েদার সাবেক নেতা শারার মাথার দাম এক সময় ১০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে গত মে মাসে রিয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আল-শারার বৈঠককে বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার ওপর বেশিরভাগ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। একইসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল সিরিয়া গঠনে দামেস্কের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে উত্থাপন করা গাজায় যুদ্ধবিরতির খসড়া প্রস্তাবে এ নিয়ে ছয়বারের মতো ভেটো দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সর্বশেষ প্রস্তাবটির খসড়ায় গাজায় অবিলম্বে নিঃশর্ত ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছিল। সেই সঙ্গে ইসরাইলকে সব ধরণের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ত্রাণ সরবরাহ করতে দেওয়ার কথাও বলা ছিল। এর বিপরীতে খসড়া প্রস্তাবটিতে গাজায় জিম্মি অবস্থায় থাকা ইসরাইলিদের অবিলম্বে সম্মানজনক মুক্তির শর্তও ছিল। স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচিত ১০ সদস্যদেশ এ খসড়া প্রস্তাব তুলেছিল। স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিয়েছে। বাকি ১৪ সদস্য দেশ খসড়া প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে। ওয়াশিংটনের এমন পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে হামাস। একে ‘গণহত্যার অপরাধের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে জড়িত থাকা’ বলে চিহ্নিত করেছে। ভোটাভুটির আগে জাতিসংঘে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘গাজায় দুর্ভিক্ষ এখন নিশ্চিত একটি বিষয়। অনুমান নয়, ঘোষণা নয়— এটা এখন নিশ্চিত।’ প্রায় দু বছর ধরে চলা ইসরাইলের নির্বিচার হামলায় গাজায় নিহতের সংখ্যা ৬৫ হাজার ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৫ জন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন বলেন, জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতার সিদ্ধান্ত বহাল আছে। আসন্ন সাধারণ এই অধিবেশনের সভাপতিত্ব নিয়ে বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিন মুখোমুখি অবস্থানে নেই। চার বছর আগে আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছিলাম। উপদেষ্টা জানান, আমাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা ছিল সাইপ্রাসের। ফিলিস্তিন এই নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অনেক পরে নিয়েছে। তবে এতে কেউ কারো মুখোমুখি নয়। উপদেষ্টা বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠায় আলোচকদের মেরে ফেলার চেষ্টা অদ্ভূত ঘটনা। এটা ইসরায়েলের গর্হিত কাজ। সোমবার দোহায় আরব-ইসলামিক দেশগুলোর জরুরি বৈঠক হয়। সেখানে থেকে ফিরে কাতারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন উপদেষ্টা।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই গণহত্যায় উস্কানি দিচ্ছে বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। ৭২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে, গণহত্যার দাবিকে সমর্থনের জন্য হত্যাকাণ্ডের মাত্রা, ত্রাণ প্রবেশে বাধা, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ও ফার্টিলিটি ক্লিনিক ধ্বংসসহ বিভিন্ন আগ্রাসনের তথ্য তুলে ধরা হয়। গাজায় এ পর্যন্ত ইসরায়েলি গণহত্যায় প্রায় ৬৫ হাজার ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবেন না ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার পরিবর্তে প্রতিনিধিত্ব করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ভারতের হয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে বক্তব্য রাখবেন এস জয়শঙ্কর। এর আগে যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, সেখানে লেখা ছিল ২৬ সেপ্টেম্বর বক্তব্য রাখবেন মোদি। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন মোদি। সে সময় ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন তিনি। তবে এর কয়েক মাস যেতে না যেতেই মোদির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। রাশিয়ার জ্বালানি কেনায় ভারতীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্কও আরোপ করেন ট্রাম্প। এদিকে এবারের অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেবে ফ্রান্স, কানাডা, বেলজিয়ামসহ একাধিক পশ্চিমা দেশ। এ স্বীকৃতিকে বানচাল করতে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের ভিসা বাতিল করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক গোয়েন লুইস। সাক্ষাৎকালে লুইস জাতিসংঘ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে জোরালো সহযোগিতার প্রশংসা করেন। তারা বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং চলমান সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। লুইস বলেন, জাতিসংঘ সম্পূর্ণভাবে ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচনের পক্ষে। এটি দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই পক্ষই সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী সংস্কার উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে জাতিসংঘের সম্প্রসারিত সহায়তার উপায় খুঁজে দেখেন। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন সভা এবং এই মাসের শেষ দিকে রোহিঙ্গা সম্মেলনের প্রস্তুতিও পর্যালোচনা করা হয়। উভয়ে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা তহবিলের ঘাটতি মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গা জনগণের জন্য টেকসই আন্তর্জাতিক সংহতি ও বাড়তি সমর্থনের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
ইসরায়েল বিরোধী অবস্থান নিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১৪টি দেশ। গাজায় দুর্ভিক্ষের জন্য তেল আবিবকে দায়ী করে বিবৃতি দিয়েছে ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীনসহ অন্যরা। বৈঠকে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছেন ইসরায়েল ও আলজেরিয়ার প্রতিনিধি। কেবল যুক্তরাষ্ট্রই বরাবরের মতো পক্ষ নিয়েছে ইসরায়েলের। বুধবার গাজার দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তুলে ধরতে অভুক্ত-অপুষ্টিতে ভোগা ফিলিস্তিনি শিশুদের ছবি নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে তুলে ধরেন আলেজেরিয়ার প্রতিনিধি। নিজের ১৩ বছর বয়সী ছেলের কাছে লেখা ইসরায়েলি আগ্রাসনে নিহত সাংবাদিক মরিয়ম আবু দাগ্গার আবেগঘন চিঠিও পড়ে শোনান তিনি। যদিও ইসরায়েলি প্রতিনিধি বলেন, অপুষ্টি নয়, বরং অন্য কোনো রোগে মৃত্যু হয়েছে ফিলিস্তিনি শিশুদের। ব্রিটিশ প্রতিনিধি বারবারা ওডওয়ার্ড বলেন, আধুনিক ইতিহাসে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথমবারের মতো দুর্ভিক্ষ রেকর্ড করা হয়েছে। পুরোটাই মানবসৃষ্ট। গাজার সীমান্তে খাবারের ট্রাক অপেক্ষা করছে। অথচ শিশুরা অপুষ্টিতে মারা যাচ্ছে। মার্কিন প্রতিনিধি ডরোথি শিয়া বলেন, আমরা স্বীকার করি গাজায় ক্ষুধা একটি বাস্তব সমস্যা। উল্লেখযোগ্য মানবিক চাহিদা পূরণ করা আবশ্যক। তবে, দুর্ভাগ্যবশত IPC’র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটি সঠিক নয়।
বাংলাদেশ পুলিশের একটি ফরমড পুলিশ ইউনিট কঙ্গোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগদানের উদ্দেশে মঙ্গলবার পৌনে ১টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেছেন। ৭০ নারী পুলিশ সদস্যসহ ১৮০ সদস্যের কন্টিনজেন্টের নেতৃত্বে রয়েছেন পুলিশ সুপার জান্নাত আফরোজ। বিমানবন্দরে অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম, ডিআইজি রেজাউল করিম এবং ইউএন অপারেশন্স উইংয়ের কর্মকর্তারা মিশনগামী শান্তিরক্ষীদের বিদায় জানান। উল্লেখ্য, শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের পদযাত্রা সূচিত হয় ১৯৮৯ সালে, নামিবিয়া মিশনে। বর্তমানে মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের ২১৫ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ পুলিশের ২৪ জন অকুতোভয় সদস্য জীবন উৎসর্গ করেছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন ৮০তম অধিবেশনে একই দিনে ভাষণ দেবেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এই অধিবেশন শুরু হবে। আর ২৬ সেপ্টেম্বর এই তিন নেতার ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রাথমিক সূচি অনুযায়ী, মোদির পরপরই শাহবাজ শরিফের বক্তৃতা নির্ধারিত রয়েছে। ফলে ইসলামাবাদের জন্য সরাসরি নয়াদিল্লির বক্তব্যের জবাব দেওয়ার কৌশলগত সুযোগ তৈরি হয়েছে। শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বে পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলে থাকবেন উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার ও উপদেষ্টা তারিক ফাতেমি। চলতি বছর অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য— ‘বেটার টুগেদার: এইটি ইয়ার্স অ্যান্ড মোর ফর পিস, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’। প্রথা অনুযায়ী প্রথম বক্তৃতা করবেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট। এরপর বক্তব্য দেবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। পাকিস্তান ও ভারতের পর একই দিনে ভাষণ দেবেন ইসরাইল, চীন এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস।
মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক টম অ্যান্ড্রুজ। অ্যান্ড্রুজ বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে অগ্রাধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে আপনার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, আপনার উদ্যোগেই জাতিসংঘ সদরদফতরে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও সহায়তা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের আশাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ড. ইউনূসের প্রতি বিশ্ব কৃতজ্ঞ। সম্মেলন দীর্ঘায়িত সংকটের একটি সুস্পষ্ট সমাধানের পথ তৈরি করবে এমন আশা প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য সাম্প্রতিক আর্থিক সহায়তা হ্রাসের ফলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ প্রয়োজনীয় সেবায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। তিনি অ্যান্ড্রুজকে এ নিয়ে সুপ্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান। অ্যান্ড্রুজ বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রত্যাবাসন উদ্যোগটি দুরভিসন্ধিমূলক প্রচারণার কারণে ব্যর্থ হয়েছে। তবুও তিনি স্থায়ী সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অ্যান্ড্রুজ রোহিঙ্গা ইস্যুতে ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে অনুষ্ঠিতব্য স্টেকহোল্ডার সংলাপে অংশ নিতে বাংলাদেশ সফর করছেন।
গত ২৪ ঘন্টায় একনজরে ১৩৮ টি নিউজ শেয়ার হয়েছে। আরো নিউজ দেখতে লগইন করুন। যেকোন সমস্যায় আমাদের ফেসবুক পেজ একনজর-এ যোগাযোগ করুন।