বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথম ভোট। ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনে দমন-পীড়নে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হওয়ার পর হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৬৪ জেলায় ৪২,৭৬১টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ হবে ৩০০ সংসদীয় আসনের জন্য। ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি ভোটার অংশ নেবেন, যার মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ প্রবাসী প্রথমবার ডাকযোগে ভোট দেবেন। একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ সংক্রান্ত গণভোট, যা সাংবিধানিক ও আইনি সংস্কারের রূপরেখা নির্ধারণ করবে। হাসিনার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় এই নির্বাচন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্র-ডানপন্থী বিএনপি দশদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে, আর জামায়াতে ইসলামী (জিব) এগারো দলীয় জোটের নেতৃত্বে রয়েছে, যার অংশ ছাত্রনেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোট ইসলামপন্থী দলের শক্তি, তরুণ ভোটারের প্রভাব এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নির্ধারণ করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ ও বৈদেশিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হবে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ তার ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বৃহস্পতিবারের ভোটে প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। দেশজুড়ে ১ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি পুলিশ, ১ লাখ সেনা এবং হাজারো নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি এগিয়ে রয়েছে, যার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এবং নবগঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী পদে মেয়াদসীমা ও নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণসহ রাজনৈতিক সংস্কার বিষয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মুহাম্মদ সানাউল্লাহ জানান, ৯০ শতাংশের বেশি আসনে নিরাপত্তা ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পুলিশ প্রধান বাহারুল আলম বলেন, ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রের অর্ধেকেরও বেশি সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ রাজনৈতিক সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের প্রধান নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুস তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করে নাগরিকদের ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। ভোটের প্রতি জনসাধারণের আগ্রহ তীব্র, বিশেষ করে প্রথমবারের ভোটারদের মধ্যে। পরিবহন সংকট সত্ত্বেও অনেকেই নিজ নিজ এলাকায় ফিরছেন। ইউনুস প্রশাসন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের যুব আন্দোলনের অন্যতম নেতা ২৭ বছর বয়সী নাহিদ ইসলাম আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-এর প্রধান হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত এই দলটি দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরে একটি মধ্যপন্থী বিকল্প হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে চায়। তবে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত এনসিপির ভেতরে বিভাজন সৃষ্টি করেছে এবং আন্দোলনের সংস্কারমুখী চেতনা টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই জোটে জামায়াত ৩০০ আসনের মধ্যে ২২২টিতে প্রার্থী দিচ্ছে, আর এনসিপি ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যার একটি ঢাকা-১১ থেকে নাহিদ ইসলাম নিজে লড়ছেন। ইসলাম এই জোটকে বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা এনসিপির সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটাতে সহায়তা করবে। কিন্তু বিশ্লেষক ও সমাজকর্মীরা মনে করেন, এতে জামায়াতের বিতর্কিত ভাবমূর্তি নরম হলেও এনসিপি নিজেই প্রভাব হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। জরিপে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘনিষ্ঠ দেখা যাচ্ছে, যেখানে এনসিপির ভোট ভাগ্য ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর এনসিপি স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারবে কি না, সেটিই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা সাবেক নেতা শেখ হাসিনার পতনের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। এই ভোট দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ নাগরিকরা নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন। এই নির্বাচনটি ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা, যা হাসিনার শাসনের অবসান ঘটায়। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক দিক নির্ধারণের পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে দেশটি নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর স্থিতিশীলতা ও শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনের পথে রয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল দেশটির ভবিষ্যৎ শাসন কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
২০২৪ সালের কোটা-বিরোধী আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম এবার ২৭ বছর বয়সে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-এর প্রধান হিসেবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। শেখ হাসিনার পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে সংক্ষিপ্ত সময় কাজ করা নাহিদ এখন নতুন রাজনৈতিক বিকল্পের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে তার দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ায় বিতর্কে পড়েছে, যে দলটি ১৯৭১ সালের ভূমিকার কারণে এখনো বিতর্কিত। এই জোটের ফলে এনসিপির ভেতরে বিভাজন দেখা দিয়েছে। বেশ কয়েকজন উদারপন্থী ও নারী নেতা দল ছেড়েছেন, অভিযোগ করেছেন যে দলটি প্রতিষ্ঠাকালীন অঙ্গীকার থেকে সরে গেছে। নাহিদ ইসলাম এই জোটকে বাস্তবসম্মত নির্বাচনি কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে সংস্কার ও দুর্নীতি দমনের মতো সাধারণ ইস্যুতে মিল রয়েছে। আসন ভাগাভাগি অনুযায়ী এনসিপি ৩০টি আসনে এবং জামায়াত ২২২টি আসনে প্রার্থী দিচ্ছে। জরিপে বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন নির্ধারণ করবে এনসিপি তার আন্দোলনভিত্তিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারে কি না এবং জোট তার রাজনৈতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করবে নাকি দুর্বল করবে।
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নে বুধবার রাতে জসিম উদ্দিন (৪৫) নামে এক বিএনপি নেতা হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী আব্দুল হান্নান মাসউদের সমর্থকরা শিউলি একরাম বাজারে অতর্কিতভাবে তার ওপর হামলা চালায়। পুলিশ জানায়, আহত জসিমকে নৌবাহিনীর টহল দল উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি চানন্দী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। বিএনপি সূত্রে জানা যায়, এনসিপি নেতা দিদার হোসেনের নেতৃত্বে কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। হাতিয়া উপজেলা বিএনপির নির্বাচনী প্রধান সিফ মোহাম্মদ আলাউদ্দিন অভিযোগ করেন, আব্দুল হান্নান মাসউদ নিশ্চিত পরাজয় জেনে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট ও ভোটারদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা চালিয়ে বিএনপির জনসমর্থন থামানো যাবে না। হাতিয়া থানার ওসি সাইফুল আলম জানান, পুলিশ ও নৌবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাতে অর্ধকোটি টাকা সহ এক বিএনপি স্বেচ্ছাসেবক নেতাকে আটক করেছে কোস্টগার্ড। রাত ১০টার দিকে খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। আটক মো. কাজল মৃধা কলাপাড়া পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং পটুয়াখালী-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী এবিএম মোশাররফ হোসেনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য বলে জানা গেছে। কোস্টগার্ড সূত্র জানায়, উদ্ধার করা অর্থ ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে বিতরণ করা হচ্ছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদিক, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কর্মকর্তা, এনএসআই প্রতিনিধি, কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ডিবি সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ বিষয়ে প্রার্থী এবিএম মোশাররফ হোসেনের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউসার হামিদ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহিদুল হাসানের উপস্থিতিতে নগদ ৫০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অভিযোগ করেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামী সহিংসতা, ভোটকেন্দ্র দখল, কারচুপি ও অবৈধ অর্থ ব্যবহারের মাধ্যমে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। বুধবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এসব অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও জনগণকে ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়া এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। নজরুল ইসলাম খান বিভিন্ন স্থানে জামায়াত নেতাদের অর্থসহ আটক, ভোটারদের ঘুষ দেওয়া, ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা ও সহিংসতার নানা ঘটনার উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। বিএনপির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, অনিয়মের খবর পাওয়া গেলেও জনগণের মধ্যে ভোট নিয়ে গভীর আগ্রহ ও প্রত্যাশা রয়েছে। তিনি বিএনপির বিজয়ের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং নির্বাচনে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে ভোটগ্রহণের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে প্রশাসন। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর নিরাপত্তায় ১২৪টি ভোটকেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রগুলোতে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যা সীতাকুণ্ড উপজেলা পরিষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্থাপিত ১০০ ইঞ্চি স্ক্রিনে সরাসরি মনিটর করা হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম মনিটরিং কার্যক্রম তদারকি করবেন। দুইজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সার্বক্ষণিকভাবে কেন্দ্র পরিদর্শন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে থাকবেন। উপজেলা অডিটোরিয়ামে দ্রুত ফলাফল সংগ্রহ ও ঘোষণার জন্য বিশেষ মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে। কেন্দ্রগুলোর আশপাশে যৌথবাহিনীর টহল জোরদার রয়েছে, যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন। প্রশাসন জানিয়েছে, সব ধরনের নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে, এখন অপেক্ষা ভোটারদের অংশগ্রহণের।
পাবনার চাটমোহর উপজেলার আশরাফ জিন্দামী উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মো. রুহুল আমিনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টার দিকে কয়েকজন জামায়াত ইসলামীর নেতা ওই কেন্দ্রে প্রবেশ করে রুহুল আমিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং এজেন্টের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হস্তান্তর করেন। ঘটনাটি জানাজানি হলে উপজেলা জুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুসা নাসের চৌধুরী পাবনা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার শাহেদ মোস্তফার নির্দেশে রুহুল আমিনকে প্রত্যাহার করেন। তার স্থলে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রাতের বেলায় জামায়াত নেতাদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের ঘটনাটি জনমনে নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জনের জন্ম দিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনের আগের রাতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১২৭টি অভিযোগ দায়ের করেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে টাকা দিয়ে ভোট কেনা, কেন্দ্র দখলের চেষ্টা, জালভোট প্রদান এবং হিন্দু ভোটারদের হুমকি দেওয়া। বুধবার রাতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। নজরুল ইসলাম খান বলেন, গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সবাই শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মধ্যেই থাকবেন বলে ধারণা করা হয়েছিল, কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য এমন পরিস্থিতি দুঃখজনক। তিনি আরও অভিযোগ করেন, একটি বিশেষ দল ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তিনি জানান, নির্বাচনের আগের রাতে সব প্রার্থীই কেন্দ্র খরচ পাঠান এবং লক্ষীপুরে বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির ১৫ লক্ষ টাকার কেন্দ্র খরচ নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এই অভিযোগগুলো নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও দলগুলোর পারস্পরিক অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বরিশালের উজিরপুরে ভোটকেন্দ্র থেকে অনুমতি ছাড়াই বাইরে যাওয়ার অভিযোগে দুই সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বুধবার রাত ১১টার দিকে উপজেলার হাবিবপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় (কেন্দ্র নং ৬৩)-এ এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা শিক্ষক মো. ওবায়েদুল ও আয়েশা রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রিজাইডিং অফিসারকে না জানিয়ে কেন্দ্র ত্যাগ করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা উপজেলা জামায়াতের আমীরের বাসায় গোপন বৈঠকে অংশ নেন। পরে তাদের আটক করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজাকে খবর দেওয়া হয়। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রশাসন তাদের পদ থেকে বরখাস্ত করে এবং নতুন দুজনকে দায়িত্ব প্রদান করে। তবে অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা শুধু খাবার খেতে বাইরে গিয়েছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। ইউএনও মো. আলী সুজা জানান, প্রিজাইডিং অফিসারের অনুমতি ছাড়া কেন্দ্র ত্যাগ করা নিয়মবিরুদ্ধ। নিয়ম ভঙ্গের কারণে তাদের বরখাস্ত করে নতুন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান জনগণকে গুজবে কান না দিতে আহ্বান জানিয়েছেন এবং বলেছেন, সত্যের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। মঙ্গলবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বর্তমানে গুজবের একটি সময় চলছে এবং সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। শফিকুর রহমান জনগণকে অনুরোধ করেন যেন এসব গুজবকে কোনো গুরুত্ব না দেওয়া হয়। তার বক্তব্যে তিনি বিশ্বাস প্রকাশ করেন যে শেষ পর্যন্ত সত্যেরই জয় হবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে গুজব মোকাবিলা ও জনগণকে শান্ত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে, যদিও সূত্রে অতিরিক্ত কোনো প্রেক্ষাপট বা প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি।
ঝিনাইদহ-৪ আসনের কালীগঞ্জের সলিমুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২৩টি স্বাক্ষরিত রেজাল্ট শিট জব্দের ঘটনায় কেন্দ্রটির প্রিজাইডিং অফিসার জেসমিন আরাকে অপসারণ করা হয়েছে। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাতে রিটার্নিং অফিসার ও ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে দায়িত্বহীন আচরণ কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। তার স্থলে কালীগঞ্জ শহীদ নুর আলী কলেজের প্রভাষক শামসুজ্জামান খানকে নতুন প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বুধবার রাত ৮টার দিকে সলিমুন্নেছা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ঘটনাটি ঘটে। অপসারিত প্রিজাইডিং অফিসার জেসমিন আরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী ছিলেন। খবর পেয়ে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সেলিম রেজা ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার রিজওয়ানা নাহিদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সেলিম রেজা জানান, ২৩টি স্বাক্ষরিত রেজাল্ট শিট জব্দ করে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে এবং এগুলো নির্বাচনের ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলবে না। ঘটনার পর প্রশাসন জানায়, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও জনগণের আস্থা বজায় রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ ভোটকেন্দ্রের ‘বিশেষ মুহূর্ত’ ধারণ করে পাঠালে আইফোন পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। মঙ্গলবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি রাজারহাট, ফুলবাড়ি ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোটারদের আহ্বান জানান, তারা যেন ভোটকেন্দ্রের ছবি বা ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে আপলোড দেন বা সরাসরি পাঠান। সবচেয়ে তথ্যবহুল ভিডিও প্রেরণকারীকে আইফোন পুরস্কৃত করা হবে বলে তিনি জানান। ভিডিও বার্তায় আতিক মুজাহিদ ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেন, ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট বা সহিংসতার মতো ঘটনা ঘটলে সেগুলো ধারণ করে প্রচার করতে হবে। তিনি দাবি করেন, এটি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার একটি উদ্যোগ, যাতে প্রতিটি সচেতন নাগরিক নিজেকে গণমাধ্যমের ভূমিকায় দেখতে পারেন। তার ভাষায়, প্রতিপক্ষ জনপ্রিয়তা দেখে অনিয়মের চেষ্টা করতে পারে, তাই সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে কেন্দ্র পাহারায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তার এই ঘোষণাকে ঘিরে এলাকায় আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণের এই উদ্যোগ নির্বাচনি পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
আরো ফিড দেখতে লগইন করুন।
সহজে ব্যবহারের সুবিধার্থে একনজরের ওয়েব অ্যাপটি সেটাপ করে নিন।