কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে কানাডার অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজের সঙ্গে ক্যানবেরায় যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন। এর আগে কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে তিনি একই সঙ্গে উল্লেখ করেন, কানাডা তার মিত্রদের পাশে থাকবে। এতে বোঝা যায়, তিনি আন্তর্জাতিক আইন ও মিত্রতার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছেন। এই মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে যখন ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে, যদিও কার্নি কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দেননি।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলার পর কৌশলগত কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশ্বের অন্যতম তেল পরিবহন রুট এই প্রণালি বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে অন্তত ৭০০ তেলবাহী ট্যাংকার আটকা পড়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য নির্ধারিত এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী একটি জাহাজ সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকে আছে। আগামী ২২ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আরেকটি জাহাজ রওনা হওয়ার কথা থাকলেও সেটিও বিলম্বের আশঙ্কায় রয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি সূত্র জানিয়েছে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জাহাজগুলো রওনা করতে না পারলে কাঁচামাল সংকটে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে দেশের জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়বে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বিকল্প রুট ও উৎস অনুসন্ধানের তাগিদ দিয়েছেন, যেমন আবুধাবির জায়েদ বন্দর বা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পরিশোধিত তেল আমদানি। বর্তমানে প্রায় এক মাসের মজুত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি সংকট হলে জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জে পড়বে। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে; ডিজেলের দাম কয়েক দিনের ব্যবধানে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলার থেকে ১১৮ ডলারে পৌঁছেছে।
বিনিয়োগ মন্দা, কর্মসংস্থান সংকট, রাজস্ব ঘাটতি ও রপ্তানি আয়ে পতনের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি নাজুক অবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম বেড়ে গেছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ায় বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়বে। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও কাতার থেকে তেল ও এলএনজি আমদানি বন্ধ বা ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। তারা কৃচ্ছ্রসাধন, ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা প্রবাসী আয় ও পোশাক রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইউরোপে রপ্তানি রুটে প্রতিবন্ধকতা এবং প্রবাসী শ্রমবাজার সংকোচনের ফলে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরান ঘোষণা করেছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা অব্যাহত রাখবে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ফোনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান বলে আলজাজিরা জানিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সে জানায়, আরাগচি বলেছেন, ‘শত্রুদের অশুভ তৎপরতা’ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইরানের সশস্ত্র বাহিনী থামবে না। তিনি আরও বলেন, ইরান কেবল সেই ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে যেখান থেকে ইরানের ওপর হামলার পরিকল্পনা ও পরিচালনা করা হচ্ছে এবং এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তুরস্কের আকাশসীমার দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যাওয়ার পর আঙ্কারায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়। রয়টার্স জানায়, ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি পূর্ব ভূমধ্যসাগরের ওপর ন্যাটো বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়। ক্ষেপণাস্ত্রটির লক্ষ্যবস্তু কী ছিল তা স্পষ্ট নয়। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ধ্বংসাবশেষ ভূমধ্যসাগর উপকূলের দরতিয়ল এলাকায় পড়েছে, তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
রংপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জামিনে মুক্তি পেয়ে মামলার বাদী ও সাক্ষীদের হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন জুলাইযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তারা জানান, হত্যা ও রাষ্ট্রদ্রোহসহ বিভিন্ন মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। এসব বিষয়ে পুলিশকে জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, ফলে পরিবারগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গঙ্গাচড়া, পীরগাছা ও বদরগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন এবং সাক্ষীদের ভয় দেখাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও বিএনপি নেতারা তাদের সহায়তা করছেন, যার ফলে আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে পারছেন। এতে বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজি জানান, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অপরাধীদের কেউ রেহাই পাবে না। নাগরিক সমাজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে চলমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্যে অনন্তকাল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন। মঙ্গলবার রাতে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনন্তকাল যুদ্ধ করার মতো অস্ত্রের মজুত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের পঞ্চম দিনে ইরানে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, লেবাননসহ বিভিন্ন স্থানে আরও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। ইরান তুরস্ক ও সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, সৌদি আরামকোর বৃহত্তম তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা উপকূলে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে, এতে ৮০ জন নিহত হয়েছে। ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইসরাইল ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে। এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ফিরতে চান না। ইসরাইল সতর্ক করেছে, খামেনির উত্তরসূরী যেই হোন না কেন, ইসরাইলবিরোধী অবস্থান নিলে তাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
আরব লীগ প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বুধবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটির মহাসচিব আহমেদ আবুল গেইত বলেন, এসব হামলা শুধু আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন নয়, বরং সুপ্রতিবেশী সম্পর্কের মৌলিক নীতির ওপরও আঘাত হেনেছে। গেইত আরও বলেন, ইরানের এই আগ্রাসন আরব দেশগুলোর সঙ্গে দেশটির এক নজিরবিহীন শত্রুতা তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। তিনি উল্লেখ করেন, ইরান বর্তমানে যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা আরব রাষ্ট্রগুলো ছোট করে দেখছে না, তবে এই সংকট কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর হামলার অজুহাত হতে পারে না। আরব লীগের এই বিবৃতি মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করে তাকে ‘যুদ্ধাপরাধের মন্ত্রী’ বলে আখ্যা দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে হেগসেথের কিছু বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধবিমান তেহরানের আকাশে উড়ছে এবং সেখান থেকে মৃত্যু ও ধ্বংস নেমে আসছে। বাঘায়ি বলেন, হেগসেথের এই বক্তব্য যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের স্বীকারোক্তির সমান। তিনি আরও মন্তব্য করেন, শুধু নাৎসি মানসিকতাই ঠান্ডা মাথায় অন্য দেশের ওপর মৃত্যু ও ধ্বংস নেমে আনতে পারে, শুধুমাত্র নেতার ইচ্ছা পূরণের জন্য। খবরটি প্রকাশ করেছে আলজাজিরা। এদিকে, হামলার পর প্রথম দুই দিনে প্রায় এক লাখ মানুষ তেহরান ছেড়েছে বলে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা নির্দেশ করে।
মার্কিন সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান অভিযানের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। তারা ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের আগে কংগ্রেসের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার একটি দ্বিদলীয় প্রস্তাব আটকে দিয়েছেন। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০০ সদস্যের সিনেটে ৫২ জন প্রস্তাবটির বিপক্ষে এবং ৪৭ জন পক্ষে ভোট দেন, ফলে প্রস্তাবটি আর এগোতে পারেনি। এই ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজুলেশন’ পাস হলে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানে চলমান যুদ্ধ থেকে মার্কিন বাহিনীকে সরিয়ে নিতে হতো। এর আগে একই ধরনের প্রস্তাব আনা হলেও তা ব্যর্থ হয়েছিল। সিনেটের এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কংগ্রেসের নতুন অনুমোদন ছাড়াই ইরানে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে পারবেন, এবং বর্তমান নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসছে না।
ইরান অভিযোগ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির বিভিন্ন শহরে বহু বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অন্তত ৩৩টি স্থাপনা—যার মধ্যে হাসপাতাল, স্কুল, আবাসিক এলাকা ও বাজার রয়েছে—লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, হামলায় স্কুল ও হাসপাতালের মতো বেসামরিক অবকাঠামোকে ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করা হয়েছে। তার দেওয়া তালিকায় তেহরানের নিলুফার স্কয়ারের আবাসিক ভবন, তেহরান ও আহভাজের হাসপাতাল, তেহরান গ্র্যান্ড বাজার, রাজধানীর দক্ষিণে ঐতিহাসিক গোলেস্তান প্রাসাদ কমপ্লেক্স এবং মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম রয়েছে। এছাড়া মারাগেহ শহরের আবাসিক এলাকা ও ফার্স প্রদেশের লামার্দের একটি ক্রীড়া হলও হামলার শিকার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়। ইরান জানিয়েছে, মোট ৩৩টি স্থানে হামলার প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইরাক সীমান্তবর্তী এলাকায় ‘সন্ত্রাসী তৎপরতা’ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। একই সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম ইরানে কুর্দি–ইরানি মিলিশিয়াদের একটি স্থল অভিযান শুরু হয়েছে বলে দাবি উঠেছে, যদিও কোনো পক্ষই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। আরাগচি প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্তানের নেতা বাফেল তালাবানির সঙ্গে কথা বলেছেন। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি তালাবানির সঙ্গে কথা বলেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদক বারাক রাভিদ জানিয়েছেন, এক মার্কিন কর্মকর্তা তাকে বলেছেন যে কুর্দি–ইরানি মিলিশিয়ারা উত্তর-পশ্চিম ইরানে স্থল অভিযান শুরু করেছে। তবে আলজাজিরা এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। যদিও আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা মেলেনি, ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে সম্ভাব্য সামরিক তৎপরতার ইঙ্গিত ক্রমেই বাড়ছে বলে জানা গেছে।
ইরান সতর্ক করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যদি ইরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা চালায়, তবে তারা ইসরাইলের ডিমোনা পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের এক সামরিক কর্মকর্তা এ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা আইএসএনএ। দক্ষিণ ইসরাইলের ডিমোনা স্থাপনাটিকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরাইলের নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত ডিমোনা স্থাপনাটি দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বহু বছর ধরে এটি ইসরাইলের পারমাণবিক গবেষণা ও সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ইরানের এই সতর্কবার্তা তেহরান, ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। প্রতিবেদনে ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি, ফলে এই হুঁশিয়ারির পরবর্তী কূটনৈতিক বা সামরিক প্রভাব এখনো অনিশ্চিত।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার বিষয়ে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক বিরোধিতা করেছেন বলে আলজাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানে হামলার বিরোধিতা করেছেন, আর মাত্র এক-চতুর্থাংশ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলাকে সমর্থন জানিয়েছেন। সপ্তাহান্তে পরিচালিত এই জরিপে ১,২০০-এর বেশি প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। সিএনএনের জন্য এসএসআরএস পরিচালিত আরেক জরিপে বিরোধিতা আরও বেশি দেখা গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চের মধ্যে পরিচালিত ওই জরিপে প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৬ জন ইরানে সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন, যেখানে ৪১ শতাংশ সমর্থন জানিয়েছেন। প্রায় ৬০ শতাংশ মনে করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা নেই এবং ৩৯ শতাংশ মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়নি। জরিপগুলোতে রাজনৈতিক বিভাজনও স্পষ্ট হয়েছে—ডেমোক্র্যাটদের ৮২ শতাংশ ও স্বতন্ত্র ভোটারদের ৬৮ শতাংশ হামলার বিরোধিতা করেছেন, বিপরীতে রিপাবলিকানদের মধ্যে মাত্র ২৩ শতাংশ বিরোধিতা করেছেন।
ইরানের ওপর সামরিক হামলার আগে তেহরানকে যৌথ বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির প্রস্তাব দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, এমন দাবি করেছেন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচকরা ইরানের সঙ্গে ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ আলোচনা করেছিলেন, তবে তেহরান প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান করে। প্রস্তাবের মধ্যে ছিল কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ এবং মার্কিন বিনিয়োগে যৌথ কর্মসূচি গড়ে তোলা। এর বিনিময়ে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো স্থায়ীভাবে ভেঙে ফেলতে বলা হয়েছিল। তবে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন, ইরান কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিতে রাজি হয়েছিল এবং আলোচনা চলমান অবস্থাতেই যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। ওয়াশিংটন ও মাসকাটের ভিন্ন বক্তব্যে আলোচনার শেষ পর্যায় ও হামলার কারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথভাবে ইরানে হামলার ছয় দিন পরও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এবং এর লক্ষ্য কী, তা স্পষ্ট নয়। শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন বলেছিল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করাই উদ্দেশ্য। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা হবে। পরে ট্রাম্প বলেন, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি সক্ষমতা ধ্বংস করাই লক্ষ্য। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, শাসনব্যবস্থা উৎখাত যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নয়, যদিও নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ইসরাইলের হামলার পর ইরানের পাল্টা আক্রমণ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র আগেই হামলা চালায়। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনার অভাব নিয়ে কংগ্রেসে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। রিপাবলিকানরা ট্রাম্পকে সমর্থন করলেও ডেমোক্র্যাটরা সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। ডেমোক্র্যাট সদস্য অ্যাডাম স্মিথ ও এলিজাবেথ ওয়ারেন হামলার বৈধতা ও গোয়েন্দা তথ্যের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা বলেন, এটি অসাংবিধানিক ও বিপজ্জনক যুদ্ধ এবং এতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছিল না।
আরো ফিড দেখতে লগইন করুন।
সহজে ব্যবহারের সুবিধার্থে একনজরের ওয়েব অ্যাপটি সেটাপ করে নিন।